ছবি সংগৃহীত
আদালতের নির্দেশে স্থগিত হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের অন্যতম বৃহৎ সংগঠন বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকের নির্বাচন-২০২৬। সোসাইটির সাবেক কর্মকর্তা ওসমান চৌধুরীর সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়ার অভিযোগে তার (ওসমান চৌধুরী) দায়ের করা মামলায় কুইন্স কাউন্টি সুপ্রিম কোর্ট গত ২৩ অক্টোবর শুক্রবার সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
২৫ অক্টোবর রোববার এই নির্বাচন হওয়ার কথা ছিলো। ভোটগ্রহণের মাত্র দুই দিন আগে আদালত এই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানি প্রথমে ৫ নভেম্বর জানানো হলেও পরবর্তীতে শুনানীর তারিখ ধার্য্য করা হয়েছে ১৭ নভেম্বর। এর ফলে ৩৫ হাজার ২১৫ জন ভোটারের অংশগ্রহণে নির্ধারিত নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এদিকে আদালতের সিদ্ধান্তের পর নির্বাচন কমিশন শুক্রবার সন্ধ্যায় জরুরী সংবাদ সম্মেলনে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে গভীর দু:খ প্রকাশ করে বলেছেন ওসমান চৌধুরীর মামলার নিষ্পত্তির দ্রুত সম্ভব নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হবে। খবর ইউএনএ’র।
আদালতের নথি অনুযায়ী, বিচারক চেরি এ বাগস ২৫ অক্টোবরের নির্ধারিত নির্বাচন আয়োজনের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেন। একই সঙ্গে ওসমান চৌধুরীর সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান সংক্রান্ত ২৮ আগস্টের সিদ্ধান্ত কার্যকর না করার এবং ভোটার তালিকা, সদস্যপদের আবেদনপত্র, চাঁদা পরিশোধের হিসাব ও নির্বাচনী ব্যালটসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। আদেশ অনুযায়ী, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভোটগ্রহণ, ভোট গণনা কিংবা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা যাবে না।
সিটির এলমহার্স্টস্থ বাংলাদেশ সোসাইটির নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে আদালতের আদেশ ও উদ্ভূত পরিস্থিতি তুলে ধরেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু নাসের। এসময় নির্বাচন কমিশনের সদস্য বদরুল এইচ. খান, মোহাম্মদ শামসুদ্দীন আজাদ, মোহাম্মদ রুহুল আমিন সরকার, আহবাব চৌধুরী, মিঠু হামিদ ও মোহাম্মদ দুলাল মিয়া এবং সোসাইটির সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী ও কোষাধ্যক্ষ মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া রুমি সহ অন্যান্য কর্মকর্তা এবং ট্রাষ্টি বোর্ডের সদস্য আব্দুর রহীম হাওলাদার, আজিমুর রহমান বুরহান, আতরাউল আলম, নাঈম টুটুল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নির্বাচন কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ রুহুল আমিন সরকার। পরে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু নাসের, সভাপতি আতাউর রহমান সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী ও কোষাধ্যক্ষ মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া রুমি।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু নাসের বলেন, ২৫ অক্টোবরের নির্বাচনের জন্য আমাদের শতভাগ প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু আদালতের আদেশে নির্বাচন আপাতত: স্থগিত হওয়ায় হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, আমরা দু:খিত, ভারাক্রান্ত। মামলাটি মোকাবেলা করার জন্য বৃহস্পতিবার বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কোর্টে ছিলাম। কিন্তু বৃহস্পতিবার কোন শুনানী না হওয়ায় আজ শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত আবারও আমরা কোর্টে উপস্থিত ছিলাম। সাথে আমাদের এটর্নীও ছিলেন। আবু নাসের বলেন, এদিন সকাল ১০টার দিকে কোর্টে বাদী ওসমান চৌধুরীর সাথে মামলা নিয়ে কথা বলি, সোসাইটির স্বার্থেও কথা বলি। ২০১৮ সাল থেকে এই মামলাটি চলছে। তিনি বলেন, আদালতে জজ না থাকায় জজ-এর সেক্রেটারী আমাদের উভয় পক্ষের এটর্নীর বক্তব্য শুনেন এবং পরবর্তীতে বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে আদালের সিদ্দান্তের কথা জানান। আবু নাসের আবেগ-আপ্লাত কন্ঠে বলেন, আমরা অক্লান্ত চেষ্টা করেছি কমিউনিটির আমানত রক্ষা করার। কিন্তু শত চেষ্টার পরও আজকে আমাদের এই অনাকাংখিত পরিস্থির শিকার হতে হয়েছে। আমরা আইনগতভাবে মামলা মোকাবেলা করে সত্তর নির্বাচনের ব্যবস্থা করবো।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে আবু নাসের বলেন, ওসমান চৌধুরী সোসাইটির বিরুদ্ধে বারবার মামলা করার কারনে তার বিরুদ্ধে রেজুলেশন নেয়া হয়েছে। তাতে তার ভোটার না হওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। কিন্তু কোনভাবে সে ভোটার হন এবং সোসাইটি তার ভোটার বাতিল করলে ওসমান চৌধুরী আদালতে সেই বিষয়টি তুলে ধরে মামলা করেছেন। এছাড়াও আরো অনেক পয়েন্ট রয়েছে যার প্রেক্ষিতে নির্বাচন স্থগিতাদেশ হয়েছে।
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, সোসাইটির গঠনতন্ত্র সংশোধন কমিটির মাধ্যমে ওসমান চৌধুরীর বিষয়ের সিদ্ধান্ত সাধারণ সভায় পাশ হয়। তিনি বলেন, সোসাইটির বিরুদ্ধে যে কেউ মামলা করতে পারেন তবে তাকে তার অভিযোগ সোসাইটির কার্যকরী পরিষদ ও ট্রাষ্টিবোর্ড-কে জানাতে হবে। তার অভিযোগ কার্যকরী কমিটিকে জানালেও ট্রাষ্টিবোর্ড জানে কিনা তা জানিনা। এসময় তিনি ওসমান চৌধুরীর ভোটার হওয়া এবং পরবর্তীতে তা বাতিল হওয়ার ব্যাখ্যা দেন।
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে আবু নাসের বলেন, মামলার পিছনে কোন ‘গড ফাদার’ আছে কিনা তা আমাদের জানা নেই।
এদিকে মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার উদ্দেশ্যে সাধারণ সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছিলেন ওসমান এ চৌধুরী। তার দাবি, নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন ও ২০ ডলার ফি জমা দেওয়ার পরও বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যনির্বাহী কমিটি গত ২৮ আগস্ট সর্বসম্মতিক্রমে তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে।
মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর পাঠানো প্রত্যাখ্যানপত্রে সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চলমান মামলা এবং গঠনতন্ত্রের নবম অনুচ্ছেদের ৬ নম্বর ধারার উল্লেখ ছিল। ওসমান চৌধুরীর অভিযোগ, অতীতে সংগঠনের নির্বাচনী অনিয়ম ও সাংগঠনিক কর্মকা- নিয়ে আদালতের আশ্রয় নেওয়ার কারণেই তার সদস্যপদ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ সিদ্ধান্তের ফলে তিনি এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তবে সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানের পেছনে প্রতিশোধমূলক উদ্দেশ্য ছিল- এটি বাদীর অভিযোগ থাকলেও আদালতে এখনো তা প্রমাণিত হয়নি। একইভাবে কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়েও চূড়ান্ত রায় হয়নি।
অপরদিকে সোসাইটির সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি বাংলাদেশ সোসাইটির গঠনতন্ত্রের নবম অনুচ্ছেদের ৬ নম্বর ধারার বৈধতাও চ্যালেঞ্জ করেছেন বাদী। তার যুক্তি, নবম অনুচ্ছেদের ৬ নম্বর ধারারটি নিউইয়র্কের প্রচলিত আইন ও জননীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং সদস্যদের আইনি প্রতিকার চাওয়ার অধিকার সীমিত করে।
জানা গেছে, নিউইয়র্কের সিভিল প্র্যাকটিস ল অ্যান্ড রুলসের আর্টিকেল ৭৮-সহ সংশ্লিষ্ট বিধানের অধীনে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। বাদী সদস্যপদ প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত বাতিল, তাকে বৈধ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বা পুনর্বহাল এবং সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার যোগ্যতা স্বীকৃতির আবেদন জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, মামলার নথিতে গঠনতন্ত্রের সংশ্লিষ্ট ধারা ও কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিরোধের কথা উঠে এলেও এসব বিষয়ে বাংলাদেশ সোসাইটির পূর্ণাঙ্গ আইনি জবাব বা বিস্তারিত পাল্টা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আগের নির্বাচন নিয়েও অভিযোগ: বর্তমান মামলায় ওসমান চৌধুরী সোসাইটির আগের নির্বাচন নিয়েও একাধিক অভিযোগ তুলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চ মনোনয়ন ফি নির্ধারণ, যথাযথ আবেদনপত্র ছাড়া সদস্য অন্তর্ভুক্তি এবং অন্যের সদস্যপদের চাঁদা পরিশোধের মাধ্যমে ভোটার তালিকা প্রভাবিত করার অভিযোগ। ২০১৮ সালের নির্বাচনসংক্রান্ত বিরোধে এক রাতে প্রায় ২৭ হাজার কথিত ভুয়া সদস্য অন্তর্ভুক্তির অভিযোগও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। বাদীর দাবী, এসব বিষয়ে সংগঠনের অভ্যন্তরে অভিযোগ জানিয়েও তিনি কার্যকর প্রতিকার পাননি। পরে আদালতের দ্বারস্থ হন। তার অভিযোগ, অতীতের আইনি পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায় এবারও তাঁকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা বর্তমান সাময়িক আদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কথিত ভুয়া সদস্য অন্তর্ভুক্তি, আর্থিক অনিয়ম কিংবা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কারসাজির অভিযোগে আদালতের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথাও এই আদেশে উল্লেখ নেই। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়, অপেক্ষা পরবর্তী শুনানির: আদালতের নথি অনুযায়ী, মামলাটির নম্বর ৭৩২১৭৪/২০২৬। বিবাদীদের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ সোসাইটি ইনকরপোরেটেড, সভাপতি এস এম এ রহমান ওরফে সেলিম, সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী, কোষাধ্যক্ষ মফিজুল ইসলাম ভূঁইয়া (রুমি) এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু নাসের।
আদালত প্রথমে ৫ নভেম্বর সকাল ১০টায় কুইন্স সুপ্রিম কোর্টের পার্ট ২৩, কক্ষ ১৪০-এ পরবর্তী শুনানি নির্ধারিত হলেও পরবর্তীতে শুনানীর দিন ধার্য্য করা হয়েছে ১৭ নভেম্বর।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন ঘিরে ২০১৮ সালেও ভোটার তালিকা, সদস্যপদ ও নির্বাচন পরিচালনার নিয়ম নিয়ে আইনি বিরোধ দেখা দিয়েছিল। আট বছর পর আবারও নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে আদালতের হস্তক্ষেপ সংগঠনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তি, সদস্যদের অধিকার এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

















