রোববার, ১৬ জুন ২০২৪

সাপ্তাহিক নবযুগ :: Weekly Nobojug

জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং আমার বৈপরীত্য

কাজী জহিরুল ইসলাম, কবি ও কথাশিল্পী

প্রকাশিত: ০৪:২৭, ১৫ এপ্রিল ২০২৩

জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং আমার বৈপরীত্য

ফাইল ছবি

আমি নিজেকে একদমই চিনি না। খুব সামান্য কারণে কেঁদে ফেলি। একজন অচেনা-অজানা মানুষ একটি ভারী ব্যাগ নিয়ে ফুটপাতে হাঁটছে, ব্যাগটি টানতে তার কষ্ট হচ্ছে, এই দৃশ্য দেখে আমার কান্না আসে। আবার একজন নিকট আত্মীয়ের মৃত্যুতে আমার কান্না আসে না। কী জটিল এবং বৈপরীত্য তাই না? আমার কাছে মনে হয় মানুষের মৃত্যু অবধারিত, এতে কান্নার কিছু নেই।

স্বাভাবিক বয়সে স্বাভাবিক মৃত্যু অতি স্বাভাবিক ঘটনা, এই ঘটনায় কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই। কিন্তু ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যু সংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমি কেঁদে ফেলি। ৮১ বছর বয়সে একজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একটি দীর্ঘ এবং সফল জীবন অতিবাহিত করে তিনি তার পূর্বসুরীদের পথ অনুসরণ করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে চলে গেছেন। এতে কান্নার কী আছে? এবং আমি এও বিশ্বাস করি, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সব মানুষের মৃত্যু ঘটে না।

জাফরুল্লাহ চৌধুরী সেই ব্যতিক্রমী মানুষদের একজন যিনি তার নিজের আয়ুরেখা নিজেই নির্মাণ করেছেন যাপিত জীবনের নানান অনুষঙ্গ দিয়ে। বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিতে তিনি ব্যক্তিজীবনের সকল আনন্দ দূরে ঠেলে একটি স্বাধীন মাতৃভূমির স্বপ্নকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বিবেচনা করে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশই ছিলেন অতি সাধারণ তরুণ, যুবক। লন্ডনে ডাক্তারী পেশা, বিলাশবহুল জীবন, দামী গাড়ি হাঁকানো, প্রিন্স চার্লসের দর্জিকে দিয়ে স্যুট বানিয়ে পরা, বিমান চালানোর প্রাইভেট লাইসেন্স সঙ্গে রাখা এক অঘোষিত রাজপুত্র তখন ত্রিশ বছরের টগবগে জাফরুল্লাহ। এইরকম জীবন পেছনে  ফেলে মাতৃভূমির ডাকে সাড়া দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গণ করার জন্য ছুটে আসা মানুষ শুধু বাংলাদেশে কেন পৃথিবীতেই বিরল। জাফরুল্লাহ  সেইরকম একজন মুক্তিযোদ্ধা।

কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে, রাজনীতিকদের সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছিল না। কিছুতেই মতের মিল হচ্ছিল না। ঠোঁটকাটা জাফরুল্লাহ তো আর আপোষ করার মানুষ নন। তিনি তর্ক করেন, ঝগড়া করেন। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন, ফিরে যাবেন পুরনো পেশায়, পুরনো জায়গায়, লন্ডনে। একদিন রিক্সায় চড়েন। রিক্সাচালকের সঙ্গে আলাপ শুরু করেন। রিক্সাচালক জানতে চান, কী করেন? তিনি বলেন, ডাক্তার। মনের কথাগুলো রিক্সাচালককে বলেই ফেলেন। ফিরে যাবেন লন্ডনে। রিক্সাচালক গামছা দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলেন, আফনে তো যাইবেন গা, আমরা যামু কই? এই কথাটি জাফরুল্লাকে বদলে দেয়।

তিনি ভাবেন, আমি না হয় উন্নত এবং নিরাপদ জীবনের কাছে ফিরে যাব কিন্তু বাংলাদেশের এই বিশাল জনগোষ্ঠী কোথায় যাবে? আমার এতো এতো আত্মীয়-স্বজন তারা কোথায় যাবে? তিনি সিদ্ধান্ত নেন, না, ফিরে যাবেন না। এখানেই থাকবেন এবং এদেশের মানুষের জন্য কাজ করবেন। গড়ে তোলেন দরিদ্র মানুষের হাসপাতাল, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। বাংলাদেশেরঔষধ নীতিপ্রবর্তন করে দেশের জন্য এক যুগান্তকারী ঘটনা ঘটান। দেশের সকল ক্রাইসিসে তিনি তার সাধ্যমত কাজ করেন, নির্ভয়ে পরামর্শ/উপদেশ দেন। প্রায়শই অনৈতিক রাজনীতি-বলয়ে নিমজ্জিত রাষ্ট্রক্ষমতা হীনস্বার্থে সেইসব পরামর্শ গ্রহণ করেনি, আবার কখনো করেছে। সদা হাস্যময় জাফরুল্লাহ তাতে কখনোই বিচলিত হননি, হাসিমুখে সর্বদাই তার কাজ তিনি করে গেছেন।

ব্যক্তিজীবনকে ক্রমশ যাবতীয় ভোগ-বিলাসের উর্ধে তুলে ধরেন। একই শার্ট পরছেন ত্রিশ বছর ধরে। ছিঁড়ে যাওয়া প্যান্ট সেলাই করে পরছেন বছরের পর বছর। নিজের নষ্ট হয়ে যাওয়া কিডনি তিনি বিদেশে গিয়ে রিপ্লেস করতে পারতেন। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেন দেশের অসংখ্য কিডনি বিকল হওয়া মানুষের মত তিনিও গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করাবেন, বিদেশে গিয়ে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করবেন না। কেন এই হতদরিদ্র জীবন-যাপন, কেন এই পুরনো জামা, ছেঁড়া প্যান্ট? অসংখ্যবার এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। তিনি হাসিমুখে বলেছেন, সম্পদ অপচয় করে লাভ কী? পুরোপুরি ছিঁড়ে না গেলে তো ফেলে দিতে পারি না। যৌবনে অনেক বিলাসিতা করেছি। সেগুলো ছিল কম বয়সের  ছেলেমানুষী। বিলাসিতায় আমি যে টাকা নষ্ট করেছি তা দিয়ে অনেক মানুষের উপকার করতে পারতাম। এই যে অনেক মানুষের উপকার করার চেষ্টা, প্রবণতা, মানবিক ভাবনা, এটিই ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

আমার স্ত্রী বলেন, কাঁদছ কেন? মাঝে মাঝে আমার স্ত্রী আমাকে বলেন, সম্ভবত তুমি বুড়ো হয়ে গেছ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারো না। কারো সামান্য দুঃখ কষ্ট দেখলেই কেঁদে ফেলো। কান্না কি কোনো সমাধান? আমি জানি কান্না কোনো সমাধান নয়, কিন্তু আমি আমার স্বাভাবিক আবেগের নোনাজল নিয়ন্ত্রণ করতেও চাই না। মুক্তি বলে, তুমি তো মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুকে স্বাভাবিক ঘটনা মনে করো, কখনো কাঁদো না, আজ কেন কাঁদছ? আমি বলি, ঠিক এই প্রশ্নটার উত্তর আমিও খুঁজছি। ৮১ বছরের মৃত্যু তো স্বাভাবিক একটি ঘটনাই, কিন্তু আমি কেন কাদছি? মুক্তি কিছুক্ষণ পর ওপরতলা থেকে নেমে আসে, বেশ প্রসন্ন মুখ। বলে, আমি তোমার প্রশ্নের জবাব পেয়েছি। মানুষের বয়স কত হলো এটা কোনো বিষয় নয়।

বিষয় হচ্ছে, যে মানুষটি মারা গেলেন তিনি মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত চিন্তা করতে পারছিলেন কিনা, তার চিন্তা মানবিক ছিল কিনা, তিনি পৃথিবীর জন্য ভালো কিছু করতে পারছিলেন কিনা। এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ এবং বিবেচ্য। সেই দিক থেকে জাফরুল্লাহ চৌধুরী সচল ছিলেন, তার চিন্তায় সাধারণ মানুষের, গণমানুষের কল্যাণ ছিল, এই কারণেই তোমার মস্তিস্ক তার মৃত্যুকে স্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে গ্রহণ করেনি এবং তার মৃত্যু তোমার মধ্যে শূন্যতা তৈরি করেছে। ভেতরের ক্রন্দন-তরঙ্গ থামাতে আমি আমার স্ত্রীকে, যিনি আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুও, তাকে জড়িয়ে ধরি।

লেখক: কবি ভাষাশিল্পী, হলিসউড, নিউইয়র্ক। ১২ এপ্রিল, ২০২৩।

শেয়ার করুন: