ছবি : নবযুগ
প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে এক সন্ধ্যার জন্য যেন ফিরে এসেছিল বাংলার চেনা আবহ। বাংলা গান, সুর ও সংস্কৃতির নান্দনিকতায় নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ড সিটি হয়ে উঠেছিল উৎসবমুখর। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আয়োজন করা হয় জাহিদ আলম প্রেজেন্ট মেগা মিউজিক্যাল শো ‘লাইভ ইন কনসার্ট: অ্যান আনফরগেটেবল মিউজিক্যাল নাইট’।
গত ৩ অক্টোবর, শনিবার সন্ধ্যায় ইভানজেল ক্রিশ্চিয়ান সেন্টার মিলনায়তনে শুরু হওয়া এ সংগীত আয়োজন চলে গভীর রাত পর্যন্ত। গানের সুরে, শিল্পীদের পরিবেশনায় এবং দর্শকদের উচ্ছ্বাসে পুরো মিলনায়তনজুড়ে তৈরি হয় প্রাণবন্ত এক আবহ। প্রবাসী নারী সংগঠন ‘দ্য বিউটিফুল লেডিস অব ইউএসএ’-এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ কনসার্টে বাংলা গান ও সংস্কৃতির প্রতি প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভালোবাসার এক উজ্জ্বল প্রকাশ ঘটেছে। সংগীতের মধ্য দিয়ে দেশের স্মৃতি, আবেগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে উদযাপন করাই ছিল আয়োজনটির অন্যতম আকর্ষণ।
সন্ধ্যা ৬টায় মিলনায়তনের দরজা উন্মুক্ত করার পর থেকেই নিউইয়র্ক ও আশপাশের বিভিন্ন স্টেট থেকে আসতে শুরু করেন শত শত প্রবাসী বাঙালি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। পরিবার-পরিজন, বন্ধু ও স্বজনদের সঙ্গে অনেকেই ছুটে আসেন প্রিয় শিল্পীদের সরাসরি পরিবেশনা উপভোগ করতে। বয়সের ভিন্নতা থাকলেও সংগীতের প্রতি ভালোবাসা সবাইকে এক কাতারে নিয়ে আসে। দর্শকদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানস্থল পরিণত হয় প্রবাসী বাঙালিদের এক মিলনমেলায়। কেউ এসেছেন প্রিয় শিল্পীর গান সরাসরি শুনতে, কেউবা দীর্ঘদিন পর পরিচিতজনদের সঙ্গে দেখা করতে। আবার অনেকের কাছে এই আয়োজন ছিল প্রবাসের ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা সময় বের করে বাংলা গান ও সংস্কৃতির আবহে ফিরে যাওয়ার সুযোগ। ফলে অনুষ্ঠান শুরুর আগেই দর্শকদের মধ্যে তৈরি হয় ব্যাপক উৎসাহ ও প্রত্যাশা।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই মঞ্চে উঠে উপস্থিত অতিথি, শিল্পী ও দর্শক-শ্রোতাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা ‘দ্য বিউটিফুল লেডিস’-এর সিলভি আকন্দ ও নাদিয়া চৌধুরী। তাঁদের আন্তরিক স্বাগত বক্তব্যে উৎসবের আবহ আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এরপর সোনিয়া সিরাজের সাবলীল ও প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় পর্দা ওঠে বহুল প্রতীক্ষিত মূল সাংস্কৃতিক পর্বের।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল একই মঞ্চে বাংলাদেশের জনপ্রিয় তিন কণ্ঠশিল্পীÑঝিলিক, ইমরান মাহমুদুল ও দিলশাদ নাহার কনার উপস্থিতি। তিনজনের স্বতন্ত্র গায়কি, কণ্ঠের বৈচিত্র্য ও নিজস্ব পরিবেশনা পুরো আয়োজনে যোগ করে আলাদা মাত্রা। একের পর এক গান পরিবেশনের সঙ্গে মিলনায়তনে বাড়তে থাকে উচ্ছ্বাস। করতালির শব্দ, আনন্দধ্বনি আর শিল্পীদের সঙ্গে শ্রোতাদের কণ্ঠ মেলানোর মুহূর্তে অনুষ্ঠানস্থল হয়ে ওঠে প্রাণচঞ্চল।
ইমরান মাহমুদুলের পরিবেশনা আগত দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া তৈরি করে। মঞ্চে ছিল তার ব্যান্ড আই কিংস্, যা পুরো পরিবেশনায় যোগ করে আলাদা মাত্রা। জনপ্রিয় গানগুলো পরিবেশনের সময় অনেক দর্শককে শিল্পীর সঙ্গে গলা মেলাতে দেখা যায়। প্রাণবন্ত মঞ্চ উপস্থিতি, সাবলীল পরিবেশনা ও আই কিংস্ -এর সংগীতায়োজনে ইমরান সহজেই দর্শকদের সঙ্গে তৈরি করে নেন সরাসরি যোগাযোগ। তার পরিবেশনার সময় করতালি ও উচ্ছ্বাসে পুরো মিলনায়তনে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আবহ।
দিলশাদ নাহার কনার পরিবেশনায় ফুটে ওঠে ভিন্ন এক আবেগ ও সুরের আবেশ। শক্তিশালী কণ্ঠ ও অনন্য গায়কি দিয়ে তিনি শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন। তার গান পরিবেশনের সময় দর্শকদের মনোযোগ ছিল মঞ্চের দিকে নিবদ্ধ। বাংলা গানের আবেগ ও সৌন্দর্য তার পরিবেশনার মধ্য দিয়ে নতুন করে অনুভব করেন উপস্থিত দর্শকেরা।
অন্যদিকে ঝিলিক তার স্বতন্ত্র কণ্ঠ ও প্রাণবন্ত পরিবেশনায় দর্শকদের মাতিয়ে রাখেন। তাঁর গানের সঙ্গে দর্শকেরাও কণ্ঠ মেলান এবং করতালিতে শিল্পীকে উৎসাহ দেন। মঞ্চে শিল্পীদের পারফরম্যান্সের সঙ্গে দর্শকদের প্রতিক্রিয়ার এই মেলবন্ধন পুরো কনসার্টকে করে তোলে আরও উপভোগ্য ও প্রাণবন্ত।
তিন শিল্পীর পরিবেশনার অন্যতম বিশেষ দিক ছিল তাদের গানের বৈচিত্র্য। ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের গান, শিল্পীদের নিজস্ব পরিবেশনা এবং দর্শকদের স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া মিলিয়ে পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে বজায় ছিল উৎসবের আমেজ। একদিকে যেমন ছিল জনপ্রিয় গানের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে ছিল বাংলা সংগীতের আবেগ ও নস্টালজিয়া।
অনুষ্ঠানে আলাদা মাত্রা যোগ করে ‘ফিউশন ড্যান্স ট্রুপ ইউএসএ’ -এর মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশনা। কোরিওগ্রাফার রাসেল আহমেদের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় দলটির শিল্পীরা ছন্দ, গতি ও অভিব্যক্তির সমন্বয়ে মঞ্চে তুলে ধরেন নান্দনিক ও প্রাণবন্ত নৃত্য। সংগীতের সঙ্গে নিখুঁত তাল-সমন্বয় এবং দলগত উপস্থাপনায় দর্শকদের দৃষ্টি ছিল পুরোপুরি মঞ্চে।
‘লাইভ ইন কনসার্ট: অ্যান আনফরগেটেবল মিউজিক্যাল নাইট’ কনসার্টটির মূল স্পন্সর ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এএএ সুপ্রিম প্রোপার্টি ম্যানেজমেন্টের সিইও মোহাম্মদ জাহিদ আলম। সহযোগিতায় ফ্রেমওয়ার্ক ফাইন্যান্স এলএলসি ও ড্রীম লোন ফর ড্রীম হোম। এছাড়াও সহযোগী প্রতিষ্ঠান ছিলো এনওয়াইএসডিসি, সোশ্যাল কেয়ার নেটওয়ার্ক এবং সোশ্যাল কেয়ার ফাউন্ডেশন।
অনুষ্ঠানটির আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী দেশী মিউজিত এন্ড এন্টারটেইনমেন্টের কর্ণধার জামান মনিরের পরিকল্পনা ও সমন্বয়ে দেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের নিউইয়র্কের প্রবাসী দর্শকদের সামনে একই মঞ্চে উপস্থাপন করা হয়। তার আন্তরিক উদ্যোগ ও সহযোগিতায় আয়োজনটি পায় প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর রূপ। সাউন্ড ব্যবস্থাপনায় ছিলেন সাউন্ড গিয়ারের সায়েম। তার দক্ষ পরিচালনায় শিল্পীদের কণ্ঠ ও সংগীতের ভারসাম্য ছিল চমৎকার, যা পুরো আয়োজনের শ্রুতিমাধুর্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
আয়োজনের মূল আয়োজক ‘দ্য বিউটিফুল লেডিস’-এর সিলভি আকন্দ ও নাদিয়া চৌধুরী জানান, আমরা বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পদের যথাযথ সম্মান জানিয়ে এবারের কনসার্ট আয়োজন করেছি। এবারের কনসার্টের তিনজন শিল্পীই দেশ-বিদেশে জনপ্রিয় এবং বাংলাদেশের পুরস্কার প্রাপ্ত। সফলভাবে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ায় উপস্থিত সকল দর্শক, কলাকুশলী এবং স্পন্সরদের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ প্রকাশ করেন। প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়া এবং কমিউনিটিকে এক সুতোয় বাঁধার লক্ষ্যে এমন আয়োজন ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে করার প্রতিশ্রুতি দেন তারা।

















