ছবি সংগৃহীত
স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা, মজলুম জননেতা হিসেবে খ্যাত মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী স্মরণে প্রতিষ্ঠিত ‘ মওলনা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ফাউন্ডেশন ইউএসএ-এর উদ্যোগ ও আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো ৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক ভাসানী সম্মেলন-২০২৬। সম্মেলনে বক্তারা মওলানার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, মওলানা ভাসানী এমন একজন নেতা ছিলেন যাকে চিনতে-জানতে আরো গবেষণা করতে হবে, তাঁর উপর আরো পড়াশুনা করতে হবে, জানতে হবে।
বক্তারা আরো বলেন, মওলানা ভাসানীর বিরুদ্ধে নানা আপ্রচার হয়েছে, অপপ্রচার চলছে। তিনি কখনোই হিন্দু বিদ্ধেষী নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান তথা সর্বস্তরের জনমানুষের নেতা। জাতীয় নেতা হিসেবে আমরা তার যথাযথ সম্মান জানাতে পারিনি।
বক্তারা বলেন, কিন্তু সময় ফুরিয়ে য়ায়নি। মওলানা ভাসানীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় নেতা হিসেবে মর্যাদা দেওয়া এখন সময়ের দাবী। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে স্মরণ করা উচিৎ। সম্মেলনে ১০ দফা রেজ্যুলেশন গৃহীত হয়।
গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সিটির উডসাইডের কুইন্স প্যালেসে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এবারের ৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকার নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক প্রফেসর ড. সলিমুল্লাহ খান। গেস্ট অর্ব অর্নার ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয় উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশের অন্তবর্তী সরকারের সাবেক মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়া সাথী, ভাসানী চর্চা কেন্দ্র-কলকাতা’র প্রতিষ্ঠাতা, বিশিষ্ট লেখক, গবেষক ও নির্মাতা সৌমিত্র দস্তিদার এবং ভাসানী গবেষক জুনাইদ এহসান।
ফাউন্ডেশনের সভাপতি বীর মুত্তিযোদ্ধা আলী ইমাম শিকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের মূল পর্বের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করা হয়। এরপর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হওয়ার পর মহান মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। স্বাগত বক্তব্য রাখেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ফাউন্ডেশন ইউএসএ ইনক’র সাধারণ সম্পাদক মঈনুদ্দীন নাসের এবং ভাসানীর উপর প্রবন্ধ পাঠ করেন সাবেক ছাত্রনেতা মোস্তফা করিম ফরিদ। এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন ৬ষ্ঠ মওলানা ভাসানী আন্তর্জাতিক সম্মেলন-২০২৬ উদযাপন কমিটির পৃষ্ঠপোষক সৈয়দ টিপু সুলতান, আহ্বায়ক গিয়াস আহমেদ, বিশিষ্ট রাজনীতিক নাহিদুল খান প্রমুখ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সম্মেলন উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব শাহাব উদ্দিন সাগর।
অনুষ্ঠানে ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, মওলানা ভাসানীকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা যাবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, স্বাধিকার ও জনগণের মুক্তির সংগ্রামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তাঁর উপস্থিতি ছিল। তিনি বলেন, মওলানা ভাসানী কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন কৃষক, শ্রমিক, নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের নেতা। ক্ষমতা দখলের চেয়ে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, ভাসানীর রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সাধারণ মানুষ। তিনি ক্ষমতার কাছে যাননি; বরং ক্ষমতাকে সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছেন।
মওলানা ভাসানীর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অবস্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশীয় শোষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আধিপত্য ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেও ভাসানী আজীবন সোচ্চার ছিলেন। বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের আন্দোলনকে তিনি একই সূত্রে দেখতেন। তিনি বলেন, ভাসানীর রাজনৈতিক জীবন ও চিন্তাধারাকে কেবল স্মরণসভা বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় তাঁর জনমুখী রাজনীতি, মানবতাবাদী দর্শন এবং শোষণবিরোধী অবস্থান নতুন করে পাঠ ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, মওলানা ভাসানীকে স্মরণ করার অর্থ কেবল অতীতের একজন নেতাকে স্মরণ করা নয়। তাঁকে স্মরণ করার অর্থ দেশের কৃষক, শ্রমিক, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের অধিকারের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসা।
বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চা প্রসঙ্গে ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, একটি ব্যক্তি, দল কিংবা নির্দিষ্ট সময়কে কেন্দ্র করে দেশের ইতিহাসকে বিচার করলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও রাজনৈতিক ধারা আড়ালে থেকে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল। সেই ইতিহাসে মওলানা ভাসানীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও আন্দোলনের অবদান রয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একজনকে এককভাবে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ধারণা নিয়েও ঐতিহাসিক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে একাধিক প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্বের ভূমিকা স্বীকৃত হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসও বিভিন্ন নেতা, আন্দোলন ও রাজনৈতিক ধারার সম্মিলিত অবদানের আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
মওলানা ভাসানীর মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ভাসানী কোনো সংকীর্ণ ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের রাজনীতি করেননি। হিন্দু-মুসলমানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মিলন এবং সাধারণ মানুষের অধিকারকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। ধর্ম, সম্প্রদায় বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নই ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।
মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের কথা তুলে ধরে ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, আসাম থেকে পূর্ববাংলা এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও তিনি ক্ষমতাসীনদের অন্যায়, বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের রাজনীতিতেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর মওলানা ভাসানীর রাজনৈতিক কর্মময় জীবন আলোচনার পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন কর্মকা-ের কথাও তুলে ধরেন। বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার জনগণের সরকার বলেই তিনি সন্তোষে মাওলানার মাজার জিয়ারত করার পর টাঙ্গাইলে কৃষক কর্ড কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশিত ম্যাগাজিনের মোড়ক উম্মোচনও করা হয় মূল মঞ্চে। কবিতা আবৃত্তি করেন সাদেক খান ও হারুন উজ জামান ভূঁইয়া। সাংস্কৃতিক পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করেন প্রবাসের জনপ্রিয় শিল্পী মরিয়ম মারিয়া, নীলিমা শশী ও করিম হাওলাদার। এই পর্ব সঞ্চালনায় ছিলেন সম্মেলন উদযাপন কমিটির যুগ্ম আহবায়ক এসএম ফেরদৌস।
সম্মেলনে সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ এ খান, সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকা সম্পাদক ও টাইম টেলিভিশন-এর সিইও আবু তাহের, এটিএন বাংলা ইউএসএ’র পরিচালক ফখরুল আলম, সাপ্তাহিক প্রবাস সম্পাদক মোহাম্মদ সাঈদ, সংসদ সদস্য মমতাজ আলো এবং ফাউন্ডেশনের প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ হোসেন খান, যুগ্ম আহ্বায়ক ফিরোজ আহমেদ, সমন্বয়কারী কাজী আজম সহ কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও ভাসনী ভক্ত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি-আমেরিকান উপস্থিত ছিলেন।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : শাহ নওেয়াজ (গোল্ডনে এজ হোম কয়োর), এম এ আজজি ( ইউর ড্রমি হোম কয়োর), আকতার হোসনে (র্ফামাসস্টি ), দুলাল বহেদেু (সভাপত-িঢাকা জলো এসোসয়িশেন), কামরুজ্জামান কামরুল ( খামার বাড়ি গ্রুপ), বল্লিাল চৌধুরী ( রয়িলে এস্টটে ইনভস্টের), নাহদিুল খান ( ব্যবসায়ী -আটলান্টা ), সয়ৈদ টপিু সুলতান ( র্ফামাসস্টি ), গয়িাস আহমদে ( ব্যবসায়ী ) ইমরান হোসনে চাকলাদার ( ব্যবসায়ী- ফ্লোরডিা )

















