ছবি সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি এবং এক্সিকিউটিভ অফিস ফর ইমিগ্রেশন রিভিউ চলতি মাসে ২৬ ফেডারেল প্লাজার ভেতরে বেশ কয়েকটি নতুন ইমিগ্রেশন এজলাসে আদালত পর্যবেক্ষক, সাংবাদিক এবং আইনজীবীদের প্রবেশ আটকে দিয়েছে।
বিচার বিভাগের অধীনে থাকা সংস্থা ইওআইআর গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে কোনো আইনজীবী ছাড়া রুটিনমাফিক ফেরত পাঠানো বা ডিপোর্টেশন শুনানিতে আসা অভিবাসীদের এই নতুন গোপনীয় এজলাসগুলোতে পাঠানো শুরু করে। স্বচ্ছতা ও অভিবাসন নিয়ে কাজ করা অধিকারকর্মীরা যেটিকে ‘ব্ল্যাক সাইট ডকেট’ (গোপন বিচারকাজ) হিসেবে অভিহিত করছেন, সেই আদালত কক্ষগুলো ৩য় তলায় অবস্থিত, যা সরাসরি ডিএইচএস-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত।
২৬ ফেডারেল প্লাজার ভেতরে অন্য দুটি তলায় থাকা ঐতিহ্যবাহী ইমিগ্রেশন আদালতগুলো ইওআইআর-এর অধীনে পরিচালিত হয়। আইন এবং সাম্প্রতিক একটি আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ক্ষেত্র বা ধারণক্ষমতার সমস্যা ছাড়া এসব বিচারকক্ষ সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা।
কিন্তু গত সোমবার ‘দ্য সিটি’র রিপোর্টার যখন ৩য় তলার সেই নতুন ইমিগ্রেশন আদালত কক্ষগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা করেন, তখন নিরাপত্তা প্রহরীরা তাকে ঢুকতে বাধা দেয়। পরে নতুন এজলাসের বাইরে লিফট এরিয়ায় দাঁড়িয়ে থাকার কারণে এক ডিএইচএস পুলিশ ইন্সপেক্টর সেই সাংবাদিককে গ্রেফতারের হুমকি পর্যন্ত দেন।
ইমিগ্রেশন আদালতগুলো যাতে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে, সেই দাবিতে মামলাকারী নিউ ইয়র্কবাসীদের সংগঠন ‘অ্যাক্সেস প্রজেক্ট এনওয়াইসি’-র প্রতিনিধি আইনজীবী স্টিফেন কেলি জানান, এই নতুন গোপনীয় আদালতগুলো গত জুলাই মাসের এক ফেডারেল আদালতের নির্দেশকে অমান্য করার কৌশল বলে মনে হচ্ছে। ওই আদেশে ২৬ ফেডারেল প্লাজা এবং ২৯০ ব্রডওয়ের ভেতরের ইমিগ্রেশন আদালতগুলোতে সর্বসাধারণের প্রবেশের অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। তিনি জানান, আদালত কক্ষের বন্ধ দরজা আর রুদ্ধদ্বার বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনা করে তারা নতুন করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছেন।
কেলি বলেন, ‘তারা আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধা তৈরি করে বলতে পারে না যে নিয়ম মানা হচ্ছে। আমাদের মামলা ও অর্জিত আইনি জয় কোনো নির্দিষ্ট ফ্লোর বা কক্ষের জন্য ছিল না, এটি ছিল কর্তৃপক্ষের আচরণের বিরুদ্ধে।’
ইওআইআর-এর মুখপাত্র ক্যাথরিন ম্যাটিংলি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সব মামলা যাতে সময়মতো এবং আইনগতভাবে নিষ্পত্তি করা যায়, সেজন্য তাদের সংস্থা প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন শুনানি স্থান চালুসহ সময়সূচিতে সমন্বয় আনছে। এজেন্সির নীতিমালার দিকে নির্দেশ করে তিনি বলেন, ইমিগ্রেশন আদালতগুলো সাধারণত সবার জন্য খোলা থাকলেও যেকোনো সময় তা বন্ধ রাখা যেতে পারে। তবে এই নতুন গোপন এজলাস চালুর বিষয়ে তিনি আর কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেননি।
এখন পর্যন্ত কেবল ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়া এবং ২৬ ফেডারেল প্লাজায় সশরীরে না আসা হাতেগোনা কয়েকজন বিচারকের মামলা ৩য় তলায় নির্ধারণ করা হয়েছে, ইমিগ্রেশন রেকর্ডে যাকে ‘এনওয়াই১’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। সোমবার সকালে কেবল একটি এজলাস থেকে অভিবাসীদের ৩য় তলায় পাঠানো হয়েছিল, তবে অনেক বিচারক ভবনের ১২ ও ১৪ তলায় সশরীরে উপস্থিত হয়েই অভিবাসীদের বিচারকাজ পরিচালনা করেছেন।
একটি ‘চরম উদ্বেগজনক’ পরিস্থিতি
ডিপোর্টেশনের মুখে পড়া অভিবাসীদের জন্য গড়ে তোলা এমন ‘লুকানো ট্রাইব্যুনাল’-এর খবর সম্প্রতি ওয়াশিংটন ডি.সি. এবং ভার্জিনিয়া থেকেও পাওয়া গেছে বলে এনপিআর জানিয়েছে। এই বিচ্ছিন্ন আদালত কক্ষগুলো দেখে উদ্বিগ্ন অধিকারকর্মীরা এখন পেছনের আসল কারণ উদ্ঘাটন এবং সম্ভাব্য ভয়াবহ অমঙ্গলের আশঙ্কা করছেন।
অধিকারকর্মীরা জানান, গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক সিটিতে এসব প্রাইভেট বা গোপন আদালত চালু করার পর থেকে ইউ.এস. ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট সেখানে পাঠানো কাউকে গ্রেফতার করেছে এমন কোনো প্রমাণ এখনও মেলেনি।
অভিবাসীদের শুনানির জন্য নির্ধারিত কক্ষটি বাইরে থেকে বন্ধ থাকলেও, ১২ তলার একটি ফাঁকা আদালত কক্ষে বসে ভার্চুয়ালি বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছিলেন ‘দ্য সিটি’র রিপোর্টার। সেখানে ইমিগ্রেশন বিচারক ব্রেট গেইগারের এক ক্লার্ক এবং হাতেগোনা কয়েকজন সাংবাদিক ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক সম্প্রতি নিযুক্ত বিচারক গেইগার টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছিলেন। কক্ষের একটি স্ক্রিনে ৩য় তলার সরাসরি দৃশ্য দেখানো হচ্ছিল, যেখানে আইনজীবী ছাড়া আসা অভিবাসীদের গিয়ে বসতে বলা হয়েছিল।
ভিডিওতে দেখা যায়, দেয়ালের রং চটে যাওয়া এবং আটটি চেয়ার থাকা একটি সাদা রঙের ঘরে এক দম্পতি (সাথে ৮ বছরের সন্তানসহ), ৩০ বছর বয়সী এক নারী এবং ২০-এর কোঠায় থাকা এক পুরুষ বসে আছেন।
তাদের মামলার গতিপ্রক্রিয়া অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই এগিয়েছে। বিচারক গেইগার প্রত্যেককে একজন আইনজীবী খোঁজার জন্য অতিরিক্ত কয়েক সপ্তাহ সময় দেন এবং পরে আদালতে হাজির হওয়ার নতুন তারিখ নির্ধারণ করে দেন।
তবে বিচারক বেশ কয়েকজনকে কাগজপত্র সংগ্রহ করার জন্য আবারও ১২ তলায় ক্লার্কের কাছে ফিরে যেতে নির্দেশ দেন। আর এতেই প্রশ্ন উঠেছে যে, তবে তাদের কেন প্রথমে সম্পূর্ণ আলাদা একটি তলায় পাঠানো হয়েছিল?
অলাভজনক সংস্থা ‘নিউ ইয়র্ক লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স গ্রুপ’-এর ইমিগ্রেশন আইনজীবী বেঞ্জামিন রেমি বলেন, ‘নথি জোগাড়ের দিক থেকে এটি মোটেও সুবিধাজনক নয়, আবার আইনি দিক থেকেও এটি কার্যকর নয়। সুতরাং এটি আমাকে এই ভাবনায় নিয়ে যাচ্ছে যে নিশ্চয়ই এর পেছনে কোনো গোপন উদ্দেশ্য রয়েছে।’ রেমি জানান, তিনি আইনজীবী ছাড়া আসা এক অভিবাসীর সাথে ৩য় তলায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু নিরাপত্তা প্রহরীরা তাকে আটকে দেয়।
রেমি আরও বলেন, “আমাকে সরাসরি ‘না’ বলে দেওয়া হয় এবং জানানো হয় যে মূল বিবাদী ছাড়া আর কাউকেই ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হবে না। যখন একজন আইনজীবী কক্ষে উপস্থিতই থাকতে পারেন না, তখন আইনি সহায়তা পাওয়ার অধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সামান্যতম আশাও চরম হুমকির মুখে পড়ে।”
মিডটাউনের সেন্ট পিটার্স চার্চের যাজক এবং নিয়মিত আদালত পর্যবেক্ষক ফ্যাবিয়ান আরিয়াস (যিনি ইমিগ্রেশন আদালতে প্রবেশাধিকার চেয়ে করা ‘অ্যাক্সেস প্রজেক্ট এনওয়াইসি’ মামলার অন্যতম বাদী ছিলেন) জানান, তিনিও এক দম্পতির সাথে যেতে চাইলে তাকে বাধা দেওয়া হয়। চার্চটি ওই দম্পতিকে আশ্রয়ের আবেদনপত্র পূরণে সাহায্য করছিল।
আরিয়াস বলেন, “আমার ইচ্ছা ছিল তাদের হাতে একটা জপমালা দিয়ে স্রেফ বলা, ’ঈশ্বর আপনাদের মঙ্গল করুন, আমরা আপনাদের জন্য প্রার্থনা করছি।’”
তিনি যোগ করেন, প্রহরীরা তাকে ওই তলা ছেড়ে চলে যেতে বলে। ‘এটা একদম অস্বাভাবিক, কারণ এটি একটি আদালত, আইস-এর কোনো চেকিং অফিস নয়।’
‘বিশৃঙ্খলা ও ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা’
সোমবার ৩য় তলার নতুন আদালতগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে ২৬ ফেডারেল প্লাজার বিভিন্ন তলার মধ্যে দীর্ঘ সময় ছোটাছুটি করেন ‘দ্য সিটি’র রিপোর্টার।
তথ্য কেন্দ্রে কর্মরত এক ইওআইআর কর্মী জানান, ওই কক্ষগুলো মূলত ডিএইচএস নিয়ন্ত্রণ করছে। আবার একই আদালতের অন্য এক কক্ষে কর্মরত ডিএইচএস-এর এক আইনজীবী জানান, নতুন তলার এই আদালত কক্ষগুলো কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে সে বিষয়ে তার কোনো ধারণাই নেই।
আরেক ইওআইআর কর্মী জানান, তিনি তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে একটি ইমেইল পেয়েছেন যেখানে বিচারকক্ষগুলোকে স্রেফ ‘আইনজীবী ছাড়া বিবাদীদের জন্য নতুন উদ্যোগ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মী বলেন, ‘আমি নিজে কোনোদিন ওখানে নেমেও দেখিনি।’
আদালত পর্যবেক্ষকরা জানান, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিচারক ছাঁটাই এবং ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের ফলে এমনিতেই ইমিগ্রেশন আদালত ব্যবস্থার বেহাল দশা, তার ওপর এই ‘ব্ল্যাক সাইট ডকেট’ বিভ্রান্তি আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে বিচার বিভাগ দাবি করছে, জো বাইডেনের মেয়াদে জমা পড়া প্রায় সাভার পাঁচ লাখের বেশি বকেয়া মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করাই তাদের মূল লক্ষ্য।

















