শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

সাপ্তাহিক নবযুগ :: Weekly Nobojug

নিউইয়র্কে মধ্যপন্থার  রাজনীতি বিষয়ক  আড্ডা

নিউইয়র্ক

প্রকাশিত: ০৮:২২, ৪ জুলাই ২০২৬

নিউইয়র্কে মধ্যপন্থার  রাজনীতি বিষয়ক  আড্ডা

ছবি - নবযুগ

বাংলাদেশের অতীত ও চলমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ‘মধ্যপন্থা’র নতুন রাজনৈতিক দল বিষয়ক এক আলোচনার আড্ডায় বক্তারা চলমান রাজনীতিতে দেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না বলে মতামত ব্যক্ত করে বলেছেন যে, দেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে আমরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শাসন দেখেছি।

দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিএনপি আবার ক্ষমতায় এসেছে। পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিতর্কিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলে। দেশের রাজনীতিতে নতুন সংযুক্ত হয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। বক্তারা বলেন, বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াত-এর রাজনৈতিক কর্মসূচী ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ ও জনগণকে হতাশ করছে। আর এনসিপি’র বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচী নিয়ে জনমনে নানা সন্দেহ। এমতাবস্থায় একটি মধ্যপন্থার নতুন রাজনৈতিক দলই দেশ ও দেশের জনগণ-কে সঠিক পথ দেখাতে পারে বলে আড্ডার অধিকাংশ বক্তা অভিমত ব্যক্ত করেন। 
গণ অভ্যূত্থানে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের চরমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মধ্য পন্থার নতুন রাজনৈতিক দলে প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দেশ ও প্রবাসে জনমনে নতুন চিন্তার উদ্ভব হয়েছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী-এনসিপি’র বাইরে ‘মধ্যপন্থা’র নতুন দল নিয়ে রাজনীতি সচেতন অনেকেই ভবাছেন। এই ভাবনা থেকেই নিউইয়র্কে ‘মধ্যপন্থার রাজনীতি বিষয়ক’ এক আড্ডার আয়োজন করা হয়। সিটির জামাইকাস্থ সাপ্তাহিক বাংলাদেশ পত্রিকা কার্যালয়ে গত ২৭ জুন রোববার বিকেলে আয়োজিত ব্যতিক্রমী এই আড্ডার মূখ্য আলোচক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি’র হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মির্জা গালিব। ঘরোয়া এই আড্ডার আয়োজক ছিলো আমেরিকা-বাংলাদেশ ইনিশিয়েটিভ (এবিআই) নামক নতুন থিংকট্যাঙ্ক সংগঠন। 
ব্যতিক্রমী এই আড্ডার শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন এবং আড্ডা পরিচালনা করেন এবিআই’র আহ্বায়ক ইমাম চৌধুরী। শুরুতেই তিনি আলোচনাকে গাইড করতে সাতটি পয়েন্টে একটি প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবনাগুলো ছিলো:
ক. তাত্ত্বিক ধারণা- বিশ্বব্যাপী বর্তমান লিবারেল ডেমোক্র্যাসী এবং অতীতের উম্মাতান ওয়াসাতান বা ইনক্লুসিভ মদিনা রাষ্ট্রের ধারণার প্রয়োগ সম্ভাবনা।
খ. ব্যবহারিক ধারণা- আমেরিকা ও মালয়েশিয়া রাষ্ট্র ধারণার প্রয়োগ এবং সচেতনভাবে ব্রিটিশ ইউরোপীয় ও ভারতীয় মডেল থেকে রিভার্স করা।
গ.প্রায়োগিক ধারণায় বাংলাদেশ মডেল এর উপযুক্ততা বিচার- বিদ্যমান ডান-বাম রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শে প্রভাব মুক্ত হওয়া, নৈতিক বোধযুক্ত, মতাদর্শিক ও ধর্মীয় বিতর্ক মুক্ত রাজনৈতিক সংগঠন ধারা গড়ে তোলার কৌশল পত্র তুলে ধরা।
ঘ. আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত কেন মধ্যপন্থার আদর্শিক দল নয়? সেটা ব্যাখ্যা করা।
ঘ. এনসিপি’র মধ্যপন্থার দর্শন ও কৌশল কি হবে? মানুষ কেন উপরের প্রধান তিনটি দলের পরিবর্তে এনসিপিতে যোগদান অথবা সমর্থন দেবে? এই চতুর্থ পয়েন্টে এসে এনসিপিকে নিচের সাতটি পয়েন্টে তাদের বক্তব্য বা লিখিত লিটারেচার স্পষ্ট করতে হবে।
১. আওয়ামী লীগ এবং বাম চিন্তাধারার সংগঠন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদকে তারা কিভাবে মোকাবেলা করবে? 
২. জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দুর্বলতা সফলতা কিভাবে মোকাবেলা করবে? কেননা স্বাধীনতা পরবর্তী সকল গণ-আন্দোলনের সাফল্যকে ব্যর্থ করে দিয়েছে দুর্বল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ এবং সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসন। একটি নরম ভৌগলিক জাতীয়তাবাদের প্রয়োজন থাকলেও এই জাতীয়তাবাদকে বা জাতিবাদকে রিপ্লেস করা যেতে পারে নাগরিকতাবোধ ভিত্তিক রাষ্ট্রধারণায়। যেটা আমেরিকা ও মালয়েশিয়া চমৎকারভাবে করেছে বহু জাতিভিত্তিক রাষ্ট্রধরনায়? 
এক্ষেত্রে বিভাজনের রাজনীতি মুক্ত করা দেশের একক জাতীয় চেতনা বিকাশের পূর্ব শর্ত। আর তার জন্য বাঙালী জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বিতর্কের তাই অবসান করে;  বাংলাদেশে নাগরিকতা ভিত্তিক নতুন জাতি চেতনার উন্মেষ ঘটাতে হবে। নতুন দল নতুন রাজনীতি কিভাবে সে বিষয়টি হ্যান্ডেল করবে তা স্পষ্ট করতে হবে।
৩. বাংলাদেশের অগ্রগতির পথে অন্তরায় ভারতীয় আধিপত্যবাদ মোকাবেলায় আমেরিকা চীন, পাকিস্তান এবং মুসলিম বিশ্বের সহায়তা নিতে হবে প্রাথমিকভাবে। কিন্তু নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে উপরোক্ত দেশের চাওয়া পাওয়াকে কিভাবে মোকাবেলা করবে? ভারতীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিংবা ওয়েস্টার্ন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে দেশকে বের করার কৌশল কি হবে?
৪. দেশের অধিকাংশ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সহায়ক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে গিয়ে সাম্প্রদায়িকতা এবং উগ্র ইসলাম পন্থাকে কিভাবে মোকাবেলা করবে?
 ৫. রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক কূটনৈতিক সবকিছুতে মাঝামাঝি একটা অবস্থান নিয়ে পাকিস্তান ও ইরানের মত স্বনির্ভর এবং সামরিক ও নৈতিক শক্তিতে উজ্জীবিত নতুন দেশ ও জাতি গঠন কিভাবে করবে? 
৬. বিভাজনের রাজনীতি কমিয়ে এনে  জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি প্রস্তুত এবং জাতীয় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা  অর্জন কিভাবে করবে?
৭. ১৭৫৭, ১৮৫৮, ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং ২০২৪ এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটগুলোকে কিভাবে হ্যান্ডেল করবে?
আলোচনায় সংশ্লিষ্টরা বলেন, একটি নতুন বাংলাদেশ গড়তে দেশের ছাত্র তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে জাগরণ তৈরি হয়েছে, সেই চেতনা অব্যাহত রাখতে হবে। জুলাই সনদের বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকতে হবে। জুলাই সনদ এবং গণভোটের রায়ের বাস্তবায়নে বাধ্য করতে প্রবাস থেকে জনমত গঠনে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক সংস্কৃতিক পদ্ধতিতে আমল সংস্কার ও পরিবর্তন আনতে প্রবাস থেকে একটি থিংকট্যাঙ্ক কাজ করবে।
আড্ডায় কোন কোন বক্তা দেশের রাজনীতিকদের নীতি-আদর্শের উপর অসন্তোষ আর হতাশা প্রকাশ, এমন কি এনসিপি-কে আস্থাশীল দল মনে না করার পাশাপাশি কোন কোন বক্তা সকল স্তরে সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বন্দোবস্তের বাংলাদেশ গড়ার উপর গুরুত্তারোপ করেন। 
আড্ডায় খোলামেলা আলোচনায় অংশ নেন সাপ্তাহিক বাংলাদেশ সম্পাদক ডা. ওয়াজেদ খান, বিশিষ্ট অনুবাদক ও বাংলাদেশ-এর উপদেষ্টা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সাপ্তাহিক প্রবাস-এর প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ওয়ালীউল আলম, কবি কাজী জহিরুল ইসলাম, মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট কাজী ফৌজিয়া, বাংলাদেশী স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন ইউএস এর উপদেষ্টা ডা. সৈয়দ আল আমীন রাসেল, লেখক রওশন হক, এনসিপি ডায়াসপোরা অ্যালায়েন্স ইউএসএ’র সদস্য সচিব ডা মোহাইমেন সায়মন প্রমুখ। আলোচনায় নিউইয়র্ক-নিউজার্সীর নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিদের মধ্যে আরো অংশ নেন যথাক্রমে নিজামুল শাহির, নুমায়ের হোসাইন, মাহমুদা জাহানারা, মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ, কবি আব্দুল হামিদ সোহেল, কবি আবুল বাশার, রাকিব উদ্দিন, সানজিদা নওশীন, মোহাম্মদ রশিদ, আবু ফারুক রানা প্রমুখ। 
আড্ডায় সাপ্তাহিক হককথা ও আজকের টেলিগ্রাম সম্পাদক এবিএম সালাহউদ্দিন আহমেদ, কবি কাওসার মুমিন, মোটিভেশন স্পীকার আলমাসুর রহমান, ব্যবসায়ী নুরুল খান, পেশাজীবী লিসানুর রাসুল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। 
 

শেয়ার করুন: