ছবি: সংগৃহীত
নিউইয়র্কের ভাড়াটেরা এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি আর্থিক চাপে পিষ্ট হচ্ছেন; চলতি বসন্তেও ম্যানহাটানের অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। তবে ঠিক তার উল্টা চিত্র দেখা যাচ্ছে হাডসন নদীর ঠিক ওপারেই, করোনা মহামারি চলাকালীন আবাসন ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা এক শহরতলিতে।
জাম্পার ন্যাশনাল রেন্ট রিপোর্ট-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে নিউ ইয়র্ক সিটিতে শোবার ঘরের (ওয়ান-বেডরুম) গড় ভাড়া রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে ৪,৬৮০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। অন্যদিকে, জার্সি সিটিতে ধারণার চেয়েও অনেক বেশি নতুন অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি হওয়ার কারণে সেখানে ভাড়ার বাজারে এক বড় ধরণের ধস নেমেছে। ফলে জার্সি সিটির বর্তমান ভাড়া ২০২৪ সালের সেই লাগামহীন পরিস্থিতির চেয়েও অনেক নিচে অবস্থান করছে।
ভাড়ার এই বিপরীত চিত্রটি মূলত পুরো দেশের আবাসন বাজারের একটি খ-িত রূপ তুলে ধরে। একদিকে যেমন পর্যাপ্ত বাড়ির জোগান না থাকা উপকূলীয় শহরগুলোতে বাড়িওয়ালারা আবারো ভাড়াটেদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছেন, অন্যদিকে অতিরিক্ত বাড়ি তৈরি হওয়া বাজারগুলো এখনো অতিরিক্ত জোগানের ধকল কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।
করোনা মহামারির পর জার্সি সিটি নিউ ইয়র্ক মেট্রো এলাকার অন্যতম ব্যস্ত আবাসন উন্নয়ন কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। কারণ, একটু বেশি জায়গা ও তুলনামূলক কম ভাড়ার আশায় ম্যানহাটন ছেড়ে পালিয়ে আসা ভাড়াটেদের ব্যাপক চাহিদাকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু হাজার হাজার নতুন অ্যাপার্টমেন্ট যখন একসাথে বাজারে চলে আসে, তখন বাড়িওয়ালাদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ক্ষমতা এক নিমেষেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
জাম্পারের ক্রিস্টাল চেন মিডিয়াকে বলেন, ‘ভাড়ার এই তীব্র পতনটি মূলত ২০২৫ সালের একটি ঘটনা। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এক কামরার ফ্ল্যাটের ভাড়া সর্বোচ্চ প্রায় ৩,৪৩০ ডলারে উঠেছিল। কিন্তু গত বছর তা মারাত্মকভাবে কমে গিয়ে ২০২৫ সালের আগস্টে সর্বনি¤œ ২,৬৫০ ডলারে নেমে আসে। অর্থাৎ, এক বছরেই ভাড়া কমেছিল প্রায় ২২%।’
চেন আরো বলেন, ‘এর পর থেকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে একটা স্থিতিশীল অবস্থায় এসেছে। ২০২৬ সালের মে মাসের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে এক কামরার ফ্ল্যাটের গড় ভাড়া ২,৮৬০ ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ২.১% কম।’
ভাড়ার এই নি¤œমুখী প্রবণতা ভাড়াটেদের জন্য এক বিরল দরকষাকষির সুযোগ এনে দিয়েছে, অথচ মহামারিকালীন অভিবাসন বাড়ার সময়ে এ এলাকাটি অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হিসেবে কুখ্যাতি পেয়েছিল।
চেন বলেন, ‘এর সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যা হলো—যোগান। পুরো নিউ ইয়র্ক মেট্রো অঞ্চলের মধ্যে জার্সি সিটি ছিল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের জন্য অন্যতম ব্যস্ত একটি বাজার। মহামারি-পরবর্তী সময়ে চাহিদার যে জোয়ার তৈরি হয়েছিল, তা ধরতে গিয়ে আবাসন ব্যবসায়ীরা এখানে হাজার হাজার নতুন ফ্ল্যাট তৈরি করেন।’
চেন বলেন, ‘যখন এই বিশাল সংখ্যার ফ্ল্যাটগুলো একসাথে বাজারে চলে এলো, তখন ফাঁকা ঘরগুলো ভাড়া দেওয়ার জন্য বাড়িওয়ালারা ভাড়ার অঙ্ক কমাতে বাধ্য হলেন। এই নির্মাণ বিপ্লবের কারণেই আজ ভাড়াটেরা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছেন।’
জার্সি সিটির এই পতন ম্যানহাটনের পুরোপুরি বিপরীত, যেখানে বছরের পর বছর ধরে সীমিত আবাসন উন্নয়ন এবং খালি ফ্ল্যাটের তীব্র সংকটের কারণে ভাড়া অভূতপূর্ব উচ্চতায় গিয়ে ঠেকছে।
জাম্পারের রিপোর্ট অনুযায়ী, নিউ ইয়র্ক সিটির এক কামরার ফ্ল্যাটের গড় ভাড়া মাত্র এক মাসেই ৩.১% বেড়ে ৪,৬৮০ ডলারে পৌঁছেছে, যা গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কোম্পানির করা ভাড়ার ট্র্যাকিং ইতিহাসে সর্বোচ্চ। নিউ ইয়র্ক এবং সান ফ্রান্সিসকোর দুই কামরার (টু-বেডরুম) ফ্ল্যাটের ভাড়া এখন যৌথভাবে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল হিসেবে ৫,৫০০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ম্যানহাটনে খালি ফ্ল্যাটের হার এখনো ২%-এর নিচে রয়েছে, এবং যে কয়টি ফ্ল্যাট খালি হচ্ছে তা সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত গতিতে ভাড়া হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক ভাড়াটে বর্তমানের এই উত্তাল বাজারে নতুন ফ্ল্যাট খোঁজার ঝুঁকি না নিয়ে পুরোনো চুক্তি বা ভাড়ার ফ্ল্যাটেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কারণ বর্তমানের চুক্তিবদ্ধ ভাড়া এবং নতুন চাওয়া ভাড়ার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
জাতীয়ভাবেও গত দুই বছরের স্থবিরতার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামগ্রিক বাড়িভাড়া আবারো বাড়তে শুরু করেছে।
মে মাসে জাম্পারের জাতীয় গড় এক কামরার ফ্ল্যাটের ভাড়া ০.৭% বেড়ে ১,৫১৯ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৫ সালের বসন্তের পর এক মাসে সবচেয়ে বড় লাফ। অন্যদিকে দুই কামরার ফ্ল্যাটের ভাড়া ০.৪% বেড়ে ১,৯০৩ ডলারে পৌঁছেছে।
জাম্পারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শন মুলহাহি এই রিপোর্টে বলেন, ‘জাতীয় গড় হিসাবটি আসলে বর্তমানের দুটি পুরোপুরি ভিন্ন আবাসন বাজারকে আড়াল করে রাখছে। যেসব উপকূলীয় শহরে বাড়ির জোগান সীমিত, সেখানে বাড়িওয়ালারা খুব তাড়াতাড়ি ভাড়ার ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছেন। অন্যদিকে সান বেল্ট এলাকার বেশিরভাগ অঞ্চলে আবাসন অপারেটররা গত কয়েক বছরে তৈরি হওয়া ফ্ল্যাটের বিশাল জোগান সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাজারে চাহিদা রয়েছে, তবে অতিরিক্ত এই জোগান স্বাভাবিক হতে আরো কিছুটা সময় লাগবে।’

















