ছবি: সংগৃহীত
ইরান যুদ্ধের অত্যন্ত সন্দেহজনক সময়ে হওয়া ৮০ কোটি (৮০০ মিলিয়ন) ডলারেরও বেশি মূল্যের তেলের বাণিজ্য খতিয়ে দেখছে ওয়াল স্ট্রিটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। ইরান যুদ্ধের সাথে জড়িত ইনসাইডার ট্রেডিং বা ভেতরের তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে ব্যবসার ক্রমবর্ধমান অভিযোগের মধ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
গত ২৩ মার্চ ভোররাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে দেওয়া একটি পোস্টে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দেন। ঠিক তার কয়েক মুহূর্ত আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক তেলের ফিউচার্স মার্কেটে বিপুল পরিমাণ তেল হাতবদল হয়।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান সেনাপতির (কমান্ডার-ইন-চিফ) এই আকস্মিক হামলা স্থগিতের সিদ্ধান্তের ফলে তেলের দাম এক ধাক্কায় প্রায় ১৩% পর্যন্ত নেমে যায়। আর এর সুবাদে ওই দিন অপরিশোধিত তেলের ফিউচার্স কেনাবেচা করা অন্তত পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ৫০ লাখ (৫ মিলিয়ন) ডলার বা তার চেয়েও বেশি মুনাফা লুটে নেয়।
সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, কমোডিটি ফিউচার্স ট্রেডিং কমিশন এখন এই অস্বাভাবিক ট্রেডিং ভলিউমের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। তাদের আশঙ্কা, ইরান যুদ্ধ-সংক্রান্ত কোনো গোপন বা ভেতরের তথ্য কোনো ইনসাইডার (ভেতরের ব্যক্তি) আগেভাগেই ফাঁস করে দিয়েছিল।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডেভিস ইঙ্গল মিডিয়াকে বলেন, ‘সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারের নৈতিকতা সংক্রান্ত নির্দেশনাবলীর আওতাভুক্ত, যা আর্থিক সুবিধার জন্য যেকোনো অপ্রকাশিত তথ্য ব্যবহার করা নিষিদ্ধ করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ ধরনের কর্মকা-ে জড়িত আছেন, এমন কোনো ইঙ্গিত দেওয়া ভিত্তিহীন এবং একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন সাংবাদিকতা।’
জানা গেছে, সিএফটিসি-এর এই তদন্তের আওতায় অন্তত তিনটি কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে লন্ডনভিত্তিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘কিউব রিসার্চ অ্যান্ড টেকনোলজিস’, রিয়েল এস্টেট অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফোরজা ফান্ড লিমিটেড’ এবং ফরাসি জ্বালানি জায়ান্ট ‘টোটালএনার্জিস’।
জার্নাল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সন্দেহজনক বাণিজ্য থেকে এই প্রতিষ্ঠানগুলো যথাক্রমে প্রায় ৫০ লাখ ডলার, ১ কোটি ডলার এবং ২ লাখ ডলার মুনাফা অর্জন করেছে।
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে এমন সন্দেহজনক সময়ে বাজি ধরার ঘটনা এই ২৩ মার্চেরটিই প্রথম নয়। জার্নাল-এর তথ্যমতে, গত ৬ মে ইরান যুদ্ধ অবসানের আলোচনা-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশের ঠিক আগে, প্রায় ৭০ কোটি ডলার মূল্যের অপরিশোধিত তেলের ফিউচার্স দ্রুত হাতবদল হয়েছিল।
গত মাসে, ভেনেজুয়েলার একনায়ক নিকোলাস মাদুরো কখন গ্রেফতার হতে পারেন, সেই সময়কাল নিয়ে প্রেডিকশন মার্কেট ‘পলিমার্কেট-এ বাজি ধরে ৪ লাখ ডলারেরও বেশি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের এক সেনা সদস্যের বিরুদ্ধে গোপন তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়।
ইতিমধ্যে, হোয়াইট হাউস তাদের কর্মীদের প্রেডিকশন মার্কেট এবং অন্যান্য ফিউচার্স মার্কেটে বাজি ধরার জন্য ভেতরের কোনো গোপন তথ্য ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে বলে জার্নাল জানিয়েছে।
সিএফটিসি-এর তদন্তের মুখে থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়নি। তাছাড়া ফিউচার্স মার্কেটে ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের অপরাধ প্রমাণ করা বেশ কঠিন। কারণ এই বাজারের একটি বড় অংশই অ্যালগরিদম (কম্পিউটার প্রোগ্রাম) দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়।
ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ জ্বালানি সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে। আর মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলোতে হামলা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে তেলের ফিউচার্স মূল্য প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের কাছাকাছি ঘুরপাক খাচ্ছিল, বাণিজ্যের পরিমাণও ছিল চড়া। তবে যুদ্ধ অবসানের একটি চুক্তির নতুন আশার আলো দেখা দেওয়ায় গত বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমে প্রায় ৯০ ডলারে নেমে আসে।
২৩ মার্চের এই বাণিজ্য সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরও নজর কেড়েছিল। ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের ঠিক আগে, ভোররাতের সাধারণ বাণিজ্য যেখানে শতকের ঘরে থাকার কথা, সেখানে তা আচমকা হাজারে গিয়ে ঠেকলে বিনিয়োগকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
যেহেতু অনেক প্রতিষ্ঠান অ্যালগরিদম এবং মানব ট্রেডারদের যৌথ মিশ্রণে কাজ করে, তাই যেকোনো নির্দিষ্ট বাণিজ্যের পেছনের আসল উদ্দেশ্য খুঁজে বের করা বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে তদন্তের সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিএফটিসি যেসব প্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি হয়েছিল, তাদের কেউ কেউ ২৩ মার্চ ভোররাতের এই বাজি ধরার পেছনে একটি নির্দিষ্ট সংবাদ নিবন্ধের কথা উল্লেখ করেছে।
তদন্তের বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা জার্নাল-কে জানিয়েছেন, ট্রাম্পের পোস্টের ঠিক ১৫ মিনিট আগে ‘সেমাফোর’ একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম ছিল : ‘হামলা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও ইরান যুদ্ধ থেকে প্রস্থানের পথ খুঁজছে হোয়াইট হাউস।’

















