ছবি: সংগৃহীত
গত অর্ধশতাব্দী ধরে গলায় কিছু আটকে শ্বাসরোধ হওয়ার সমস্যায় ‘হাইমলিক ম্যানুভার’ একটি স্বীকৃত সমাধান হলেও গত এক দশকে সংবাদমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে শ্বাসরোধ নিরোধক বা শ্বাসনালী পরিষ্কার করার যন্ত্রগুলোর জনপ্রিয়তা অনেক বেড়েছে।
২০২১ সালে সাউথ ক্যারোলিনার একটি রেস্তোরাঁয় এক অপরিচিত ব্যক্তি ১০ মাস বয়সী এক শিশুর প্রাণ বাঁচাতে ‘লাইফভ্যাক’ নামক একটি যন্ত্র ব্যবহার করার পর এটি জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে। ২০২৩ সালে ওহাইওর অন্টারিওতে এক পুলিশ অফিসারের বডিক্যাম ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি একটি খেলনা পেরেক গিলে ফেলা শিশুর শ্বাস ফেরাতে লাইফভ্যাক ব্যবহার করছেন।
হাতে ধরা যায় এমন এই যন্ত্রগুলো আক্রান্ত ব্যক্তির নাক ও মুখে স্থাপন করে একটি ভ্যাকুয়াম বা শোষণ প্রক্রিয়া তৈরি করা হয়। ব্যবহারকারী যন্ত্রের হাতলটি উপরের দিকে টানলে ভেতরে বাতাসের টান তৈরি হয় এবং গলায় আটকে থাকা বস্তুটি বের হয়ে আসে।
বর্তমানে নিউইয়র্ক সিটিসহ সারা দেশের স্কুলগুলোতে এই ধরনের যন্ত্র রাখা বাধ্যতামূলক করার জন্য একটি জোরালো আন্দোলন শুরু হয়েছে। সিটির প্রতিটি স্কুল ভবনে এই যন্ত্র রাখা বাধ্যতামূলক করার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাবেক সিটি কাউন্সিল সদস্য ক্রিস্টি মারমোরাটো।
এনওয়াই১-এর সাথে একটি সাক্ষাৎকারে মারমোরাটো ব্যাখ্যা করেছেন কেন এ বিষয়টি তার কাছে অত্যন্ত ব্যক্তিগত। মারমোরাটো বলেন, ‘৩০ বছর আগে আমরা আমার দাদাকে হারিয়েছি। একটি রেস্তোরাঁয় তার গলায় খাবার আটকে গিয়েছিল। তারা হাইমলিক ম্যানুভার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সেটি কাজ করেনি।’
রাজনীতিতে আসার আগে মারমোরাটো এক্স-রে টেকনিশিয়ান হিসেবে স্বাস্থ্যখাতে ২০ বছর কাজ করেছেন। তিনি ডজনেরও বেশি কাউন্সিল সদস্যকে এই যন্ত্রগুলো স্কুলে রাখার বিলে সমর্থন দিতে রাজি করান। তার স্পনসর করা এ বিলটি গত ডিসেম্বরে মারমোরাটোর মেয়াদের ঠিক শেষ মুহূর্তে পাস হয়। তবে আইনটি তখনই কার্যকর হবে, যখন কোনো যন্ত্র শিশুদের শ্বাসরোধের জরুরি অবস্থায় ব্যবহারের জন্য এফডিএ থেকে অনুমোদন পাবে এবং আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বা আমেরিকান রেড ক্রস থেকে এটি ব্যবহারের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা আসবে।
তবে এই যন্ত্রগুলোর বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি এবং বাণিজ্যিক প্রচার নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডক্টর ড্যারিয়া লং এই অ্যান্টি-চোকিং ডিভাইসগুলো নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা করেছেন।
ডক্টর লং বলেন, ‘আমি একজন ইআর ডাক্তার এবং একজন মা। আমার তিনটি সন্তান আছে, তাই শ্বাসরোধের ক্ষেত্রে আমাদের সাহায্য করার মতো ভালো কিছু থাকলে আমি অবশ্যই সেটির পক্ষে। আমি এই বিষয়ে অনেক গভীর অনুসন্ধান করেছি। কারণ এই যন্ত্রগুলো নিয়ে অনেক ভাইরাল ভিডিও রয়েছে। আমি নিজে সবকটি যন্ত্র কিনেছি এবং নিজের ওপর, সন্তানদের ওপর ও স্বামীর ওপর যতটা সম্ভব পরীক্ষা করে দেখেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি এই সংক্রান্ত বিদ্যমান নথিপত্র এবং গবেষণাগুলোও খুঁটিয়ে দেখেছি।’
কিন্তু তিনি যা খুঁজে পেয়েছেন তা খুব একটা সহজবোধ্য নয়। ডক্টর লং বলেন, ‘বর্তমানে স্বাধীন কোনো উৎস থেকে এমন কোনো হিউম্যান ডেটা বা মানুষের ওপর পরীক্ষার তথ্য নেই, যা প্রমাণ করে যে এই যন্ত্রগুলো প্রচলিত প্রাথমিক চিকিৎসার চেয়ে বেশি কার্যকর। এছাড়া ক্যাডাভার বা মৃতদেহের ওপর করা কিছু পরীক্ষায় দেখা গেছে, একাধিকবার ব্যবহারের ফলে এটি কিছু ক্ষেত্রে ফোলা বা প্রদাহ তৈরি করতে পারে।’
আমেরিকান রেড ক্রস, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং এফডিএ, সবাই পরামর্শ দিয়েছে , কেউ শ্বাসরোধের শিকার হলে প্রথমে হাইমলিক ম্যানুভারের মতো প্রতিষ্ঠিত নিয়মগুলো অনুসরণ করতে হবে। যদি হাইমলিক বা পিঠে থাপ্পড় কাজ না করে, কেবল তখনই এই যন্ত্রগুলোকে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
ফিল হাইমলিক এই যন্ত্রগুলোর একজন কড়া সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তার বাবা ডক্টর হেনরি হাইমলিক ছিলেন ‘হাইমলিক ম্যানুভার’-এর উদ্ভাবক। ফিল হাইমলিক বলেন, ‘আমার বাবা এই যন্ত্রগুলোর বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, শ্বাসরোধের সময় মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা মৃত্যুর আগে আপনার হাতে মাত্র চার মিনিট সময় থাকে। বাবা সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, সেই জরুরি মুহূর্তে কোনো যন্ত্র খুঁজতে যাওয়া আক্রান্ত ব্যক্তির জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি হতে পারে।’
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন সিটি কাউন্সিল এই বিলটি নিয়ে আলোচনা করছিল, তখন নিউ ইয়র্ক স্টেট অফিস অফ চিলড্রেন অ্যান্ড ফ্যামিলি সার্ভিসেস রাজ্যজুড়ে শিশু যতœ কেন্দ্রগুলোতে একটি চিঠি পাঠিয়ে জানায় যে, ‘প্রতিষ্ঠিত জীবন রক্ষাকারী নিয়মের মধ্যে শ্বাসরোধ নিরোধক যন্ত্রগুলো অন্তর্ভুক্ত নয়।’
এর সাত মাস পর এফডিএ সরাসরি লাইফভ্যাক কোম্পানিকে একটি সতর্কবার্তা পাঠায়। সেখানে বলা হয়, ‘এফডিএ চিন্তিত যে আপনার প্রতিষ্ঠানের লাইফভ্যাক রেসকিউ সাকশন ডিভাইসের অননুমোদিত বিপণন এবং বিতরণ জনস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।’
মারমোরাটোর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে তিনি বিলটি পাসের সময় কোনো চিকিৎসা কর্তৃপক্ষের সাথে পরামর্শ করেছিলেন কি না। মারমোরাটো উত্তরে বলেন, ‘আমি ২৪ বছর চিকিৎসা ক্ষেত্রে ছিলাম। আমার সিপিআর সার্টিফিকেট আছে এবং আমি জানি যে হাইমলিক ম্যানুভারই হলো প্রথম প্রতিরক্ষা। আমরা শুধু জানি যে আমাদের কাছে বাড়তি কিছু একটা আছে যা সম্ভবত কারও প্রাণ বাঁচাতে পারে।’
কয়েক বছরের সতর্ক বার্তার পর, গত মার্চ মাসে এফডিএ নতুন নির্দেশনা জারি করে এবং যুক্তরাষ্ট্রে শ্বাসরোধের চিকিৎসায় ‘সেকেন্ড-লাইন ট্রিটমেন্ট’ বা দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে লাইফভ্যাকের বিপণন ও বিতরণের অনুমোদন দেয়।
এই যন্ত্রের উদ্ভাবক আর্থার লি বলেন, এফডিএ-র এই পরিবর্তন রাতারাতি আসেনি। লি বলেন, ‘এজন্য আমাদের দুই বছর নিবিড় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, শক্তির পরীক্ষা, মৃতদেহের সিমুলেশন, বায়োস্ট্যাটিস্টিশিয়ান বিশ্লেষণ এবং প্যাকেজিং, সবকিছুর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।’
তবে স্কুলগুলোতে এই যন্ত্র রাখা সংক্রান্ত আইনটি এখনো কার্যকর হয়নি। কারণ আমেরিকান রেড ক্রস এবং আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন এখনো এর নিরাপত্তা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করছে।
এরই মধ্যে লি বলছেন, তিনি তার কোম্পানির লক্ষ্য অর্থাৎ প্রাণ বাঁচানোর দিকেই মনোযোগ দেবেন। লি বলেন, ‘প্রশিক্ষিত হোন, একটি লাইফভ্যাক সাথে রাখুন; আমরা প্রতি পাঁচ দিনে একজন শিশুর মৃত্যু রোধ করতে পারব এবং আমাদের এমন একটি বছর আসবে যখন স্কুলে কোনো শিশুই মারা যাবে না।’

















