শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

সাপ্তাহিক নবযুগ :: Weekly Nobojug

সাংবাদিক হাবিব রহমান’র কলাম

গণতন্ত্রের পথ কি  ‘ট্রাক’ দিয়ে আটকানো যায়!

হাবিব রহমান

প্রকাশিত: ২০:১৫, ৩১ জুলাই ২০২৬

গণতন্ত্রের পথ কি  ‘ট্রাক’ দিয়ে আটকানো যায়!

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যদি কোনো বস্তুকে ‘গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক’ হিসেবে নোবেল দেওয়া যেতো, তবে নির্দ্বিধায় সেই ট্রফিটা পেত একচিলতে বালিভর্তি ট্রাক! ইতিহাসের চাকা ঘোরে, কিন্তু ট্রাকের চাকা এক জায়গায় এসে স্থবির হয়ে পড়ে।

মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা? যখন ক্ষমতার মসনদে ছিল আওয়ামী লীগ, আর বিরোধী দলে বেগম খালেদা জিয়া। হঠাৎ দেখা গেল, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর গুলশানের বাসার সামনে সারি সারি বালুর ট্রাক। না, সেখানে কোনো চার লেনের হাইওয়ে তৈরি হচ্ছিল না, আর না কোনো রাজপ্রাসাদ গড়া হচ্ছিল। সেই বালু ছিল আসলে ‘গণতান্ত্রিক অবরুদ্ধকরণ’-এর বালু। সেদিন যারা সুশীল ছিলেন, যারা নাগরিক সমাজ ছিলেন, তারা তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “অন্যায়! গণতন্ত্রের পথ বালু দিয়ে আটকানো যায় না!” বিএনপি নেতারা কান্নাকাটি করে, ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, “এ কেমন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা?”
সময় নদীর মতো বয়ে গেছে। মসনদ বদলেছে। বিএনপি এখন ক্ষমতায়, খালেদা জিয়ার সন্তান তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী। আমরা ভেবেছিলাম, ইতিহাসের শিক্ষা বোধহয় অতীত থেকে কিছু পরিবর্তন আনবে। আমরা ভেবেছিলাম, বালুর ট্রাকের সেই অভিশপ্ত স্মৃতি হয়তো ইতিহাসের জাদুঘরে স্থান পাবে।
কিন্তু আফসোস! ক্ষমতার মসনদে যে-ই বসে, ‘ট্রাক মার্কা গণতন্ত্র’-এর মহিমা থেকে কেউ বের হতে পারে না।
সম্প্রতি তরুণদের দল ‘এনসিপি’-র কর্মসূচির আগে যখন আবার সেই চেনা দৃশ্য দেখা গেল—একইভাবে রাস্তা জুড়ে  ট্রাকের সরবসউপস্থিতি।
পার্থক্য কেবল এক জায়গায়: আগের শাসনামলে যারা বালুর ট্রাকের চালক ছিলেন, আজ তারা হয়তো হেলপার। আর তখন যারা সেই ট্রাকের শিকার ছিলেন, আজ তারা চালকের পাশের সিটে বসে মুচকি হাসছেন!
রাজনীতির কি অপূর্ব সার্কাস! 
তরুণ তুর্কীরা আজ রাজপথে অধিকার চাইতে এসে দেখছে, তাদের জাতীয়তাবাদী বড় ভাইয়েরা শেখ হাসিনার কাছ থেকে অন্য কিছু না শিখলেও “কীভাবে  ট্রাক দিয়ে বিরোধীদের সাইজ করতে হয়” সেই মাস্টারক্লাসটা নিখুঁতভাবে আত্মস্থ করেছেন!
প্রশ্ন জাগে:
বালু কি কেবল রাস্তা আটকায়? নাকি দেশের মানুষের বিবেক, গণতান্ত্রিক চেতনা আর নূন্যতম লজ্জা-শরমেও বালুচাপা দেয়?
যে দলটি বছরের পর বছর ধরে ‘গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার’ আর ‘ভোটের অধিকার’-এর জিকির তুলে ক্ষমতায় এলো, তারা ক্ষমতায় এসেই নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক চর্চাকে একই পুরোনো ফ্যাসিবাদী কায়দায় বালুর ট্রাক দিয়ে পিষে দিতে চাইবে—এটা যেমন লজ্জার, তেমনি চরম বেদনার।
ক্ষমতার হাওয়া এতটাই মায়াবী যে, তা অতীতকে ভুলিয়ে দেয়। কিন্তু ক্ষমতার মালিকদের মনে রাখা উচিত: বালুর ট্রাক দিয়ে সাময়িকভাবে বিরোধী দলকে আটকানো যায়, কিন্তু ইতিহাসকে আটকানো যায় না। ইতিহাস বড়ই নির্মম। আজ যে ট্রাক দিয়ে আপনি অন্যের পথ আটকে বাহবা কুড়াচ্ছেন, কাল ক্ষমতার চাকা ঘুরলে সেই একই ট্রাকের বালু আপনার রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপর এসে পড়বে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে?
হে জাতির বিবেক, আর কত দিন ঘুমিয়ে থাকবেন? ট্রাক পরিবর্তন হয়, সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু ট্র্যাজেডি একই থাকে। বালুর ট্রাক সরিয়ে এবার অন্তত গণতন্ত্রকে একটু নিঃশ্বাস নিতে দিন! লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, নিউইয়র্ক। ৩০ জুলাই’২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ।
 

শেয়ার করুন: