ছবি: সংগৃহীত
দেখতে দেখতে ছয় বছর পার করেছে সাপ্তাহিক নবযুগ। চলতি সংখ্যাটি নবযুগের ছয় বছর বর্ষপূর্তি সংখ্যা। আগামী ১৬ জানুয়ারি যে সংখ্যা নবযুগ প্রকাশ করবে সেটি হবে সপ্তমবর্ষ পর্দাপণের প্রথম সংখ্যা মানে ৩১১ সংখ্যা। গত ছয় বছর নবযুগকে নানা প্রতিকূলতা এবং ‘ভয়কে জয়’ করে অসীম সাহস নিয়ে এগুতে হয়েছে। তাই সপ্তম বছর পদাপর্ণে নবযুগের সংকল্প হচ্ছে এখন থেকে ‘কঠিন ভয়কে ডিঙ্গিয়ে অজেয়কেও জয় করে’ সামনের দিকে এগুবে নবযুগ।
কঠিন সময় পার করলেও গেল ছয় বছরে নবযুগ’র রয়েছে অনেক সফলতা। যাত্রা শুরুর পর থেকে নবযুগ কোনো অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেনি। সব সময় চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে দৃঢ অবস্থানে থাকতে। সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল নিউইয়র্ক তথা যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশ কমিউনিটির পাশে থাকার, কমিউনিটিকে পথ দেখানোর। এ ক্ষেত্রে নবযুগ পুরোপুরি সফল হয়েছে এমনটা দাবী না করলেও বলতে পারি সফলতার অগ্রভাগে রয়েছে।
নবযুগ একটি ঐতিহাসিক পত্রিকার নাম। ১৯২০ সালে নবযুগ প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয়। নবযুগ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে ছিলেন শের-এ-বাংলা একে ফজলুল হক, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও কমরেড মুজফ্ফর আহমদ। নবযুগ প্রতিষ্ঠার একশো বছরকে মাথায় রেখে নিউইয়র্ক থেকে এই তিন আলোকিত বাঙালির আদর্শকে ধারণ করে ২০২০ সালের ১০ জানুয়ারি নিউইয়র্ক থেকে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে নবযুগ।
নবযুগ বাজারে আসার অল্প কিছু দিন পর পৃথিবী আক্রান্ত হয় ভয়াবহভাবে করোনা মহামারিতে। করোনার থাবায় ল-ভ- নিউইয়র্ক তথা যুক্তরাষ্ট্র। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে নিউইয়র্কে সবকিছু অচল। সব পত্রিকার ছাপা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু নবযুগ ওই সময় ঝুঁকি নেয়। প্রকাশনা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশ কমিউনিটির পাশে দাঁড়ায়। করোনা মহামারির ভয়কে উপেক্ষা করে প্রতি শুক্রবার পৌঁছে দেয়া হয় নবযুগ’র ছাপা কপি মানুষের হাতে হাতে। ওই সময় বাংলাদেশ কমিউনিটিতে নবযুগ তথ্যের ‘অক্সিজেন’ হিসেবে কাজ করে। করোনাকালীন পত্রিকা প্রকাশনা অব্যাহত রেখে নবযুগ ‘ভয়কে জয় করার’ সাহস সঞ্চার করেছে, মানুষকে সচেতন করার গুরু দায়িত্ব পালন করেছে। তাই সপ্তমবর্ষে পদাপর্ণে এসে আমরা বলতে পারি সেদিন আমরা ঝুঁকি নিয়েছিলাম বলেই সফল হয়েছি, একটি ইতিহাসের অংশ হতে পেরেছি। আজ আমরা গর্ব করে বলতে পারি করোনাকালীন বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো একমাত্র নিউইয়র্কের বাংলাদেশি মালিকানাধীন পত্রিকা নবযুগ। আজ নিউইয়র্কে যেখানে আমরা যায় না কেন মানুষ সে দু:সময়ে নবযুগ এর কথা কৃতজ্ঞচিত্রে স্মরণ করে। এটাই আমাদের পরম পাওয়া।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে নবযুগ কমিউনিটিকে পথ দেখাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নিউইয়র্কের বাংলাদেশ কমিউনিটির যুব সমাজে যখন মাদকের ভয়াল থাবা শুরু হয় সবার আগে নবযুগ বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে। গণসচেতনা সৃষ্টি করতে অগ্রণী ভূমিকা রাখার পাশাপাশি আয়োজন করে গোলটেবিল বৈঠকও। এ বৈঠকে কমিউনিটির সর্বস্তরের নেতবৃন্দ উপস্থিত থেকে মাদকের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখার সংকল্প ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে নবযুগ মাদকের বিরুদ্ধে বছরব্যাপী কাম্পেইন শুরু করে এবং সচেতনা সৃষ্টির লক্ষে কমিউনিটির মানুষকে সংবদ্ধ করে। নবযুগ এর ক্যাম্পেইন কমিউনিটিতে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত এবং অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করছে।
আমরা দৃঢভাবে বলতে পারি, নবযুগ এর বহু প্রতিবেদন কমিউনিটিতে সাড়া ফেলেছিল। সক্রিয় ভয়ঙ্কর খুনের আসামী চঞ্চল, তিন শিল্পীর অশ্লীলতা, বিশ্বজিতের বিরুদ্ধে মামলা, বাংলাদেশের ১০ শীর্ষ লুটেরা, ওয়াশিংটনে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ রাষ্ট্রদূত মো. শহীদুল ইসলামসহ অনেক আলোচিত প্রতিবেদন এখনও কমিউনিটির মানুষের মুখে মুখে। এসব প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে আমাদের অনেক ঝুঁকি নিতে হয়েছে। বিজ্ঞাপনদাতাদের রক্ষচক্ষুকে উপেক্ষা করতে হয়েছে। দেশ এবং প্রবাস থেকে সীমাহীন চাপ সইতে হয়েছে। আমাদেরকে নানাভাবে ভয় দেখানো হয়েছে। বিজ্ঞাপন উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনেক লেখক বছরের পর বছর লিখে আসলেও লেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু এতকিছুর পরও শিরদাঁড় করে কমিউনিটিতে দাঁড়িয়ে আছে আপনাদের প্রিয় নবযুগ।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে নবযুগ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ দিবস, রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী, নজরুল জন্মজয়ন্তী, ঈদ, পূজা-পার্বন, বড়দিনসহ বিশেষ দিনগুলোতে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এসব কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় অনেক বিজ্ঞাপনও বাদ দিতে হয়েছে।
গেল ছয় বছরে অর্থনৈতিকভাবে নবযুগ হয়তো সফল হতে পারেনি, কিন্তু শক্তি, অসীম সাহস আর পাঠকপ্রিয়তায় সফল নবযুগ। এ কারণে শুক্রবারের নবযুগ’র জন্য এখনও কমিউনিটির মানুষ অপেক্ষার প্রহর গুণে। কারণ নবযুগকে পরিবারের সদস্য হিসেবে গ্রহন করেছেন অনেকেই। শুক্রবার দুপুরে খাবারের টেবিলে যেমন পরিবারের কোন সদস্য উপস্থিত না থাকলে সবাই মিস করেন ঠিক নবযুগ এর বিষয়টিও তাই।
যাত্রা শুরুর পর থেকে নবযুগ পরিচ্ছন্ন ম্যাকআপ এবং রুচিশীলতার পরিচয় দিয়ে আসছে। নবযুগ এর সাহিত্য পাতার প্রশংসা করেন বাংলা ভাষাভাষি গুরুত্বপূর্ণ কবি, সাহিত্যিক ও লেখকরা।
নবযুগ গেল পাঁচ বছর ধরে ‘দ্যা এক্সপ্লোর’ নামে একটি ইংরেজি সেকশন চালু রেখেছে। যেটি শুরু হয়েছিল এই প্রবাসে বেড়ে উঠা দুই তরুণ সাজিদ সীমান্ত এবং লাবিব প্রান্তের সর্ম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে।
বলা বাহুল্য: প্রযুক্তির উৎকর্ষতায়ও এগিয়ে আছে নবযুগ। নবযুগ এর একটি আধুনিক ও রুচিশীল ওয়েবসাইট রয়েছে। যেখানে রয়েছে নবযুগ প্রতিষ্ঠার পর থেকে সর্বশেষ পর্যন্ত আর্কাইভ। আর নবযুগ এখন নিয়মিত বুলেটিন চালু করেছে। নবযুগ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পিডিএফ এবং অন্য আয়োজন দারুণ সাড়া ফেলেছে, যেখানে টেলিভিশনের মতো নবযুগের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদগুলো নিয়ে সাপ্তাহিক একটি পূর্ণাঙ্গ নিউজ বুলেটিন প্রতি শুক্রবার প্রচার করা হয়। একটি পত্রিকার নিউজ বুলেটিন এবং প্রেজেন্টার দিয়ে খবর পড়ানো বিশ্বের বাংলা সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে নবযুগই সম্ভত প্রথম। এই আইডিয়া কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায় সে ধারণা নিতে এখন অনেকেই আমাদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ করছেন।
মনে থাকার কথা ২০২১ সালে নবযুগ নিউইয়র্কের তারকা হোটেল লার্গডিয়া এরায়পোর্ট ম্যারিয়েটের বলরুমে একটি প্রীতি সম্মিলনের আয়োজন করেছিল। সেই সম্মিলনে তিনগুণি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের নাতনী অনিন্দিতা কাজী, নিউইয়র্ক থেকে ৩৪ বছর ধরে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান ও শিল্পী কাজী রকিবের হাতে সম্মাননা তুলে দিয়ে ‘নবযুগ সম্মাননার’ যাত্রা শুরু করে। পাঁচ শতাধিক অতিথির উপস্থিতিতে নবযুগ প্রীতি সম্মিলনের জমকালো আয়োজন ব্যাপক প্রশংসিত হয়। কমিউনিটির মানুষ এখনও রুচিশীল এবং মানসম্মত অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নবযুগের প্রীতি সম্মিলনকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেন।
নবযুগ প্রীতি সম্মিলনে নিজস্ব থিমসং, লেখকদের মঞ্চে সম্মানিত করা, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি, অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষ্টি কালচারসমেত সাংস্কৃতিক পর্ব এবং কোনো ধরনের স্পন্সর ছাড়া এতো বড় অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করার বিষয়টি কমিউনিটির মানুষ এখনও স্মরণ করে। এখানে আমরা বলতে পারি বহি:বিশ্বের সাপ্তাহিক একটি বাংলা পত্রিকা হিসেবে নিজস্ব থিমসং শুধু নবযুগরই আছে।
সফলতার ছয় বছরের যে গল্প বলেছি তার পেছনে রয়েছে অনেকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এর মধ্যে বাংলাদেশের একজন প্রভাবশালী বার্তা সম্পাদক প্রয়াত হুমায়ুন সাদেক চৌধুরী যিনি পত্রিকার শুরুর দিন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ‘ঢাকার চিঠি’ লিখতেন তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি নবযুগ’র ব্যবস্থাপনা সম্পাদক শামসুন নাহার নিম্মি, ঢাকার অফিস প্রধান হাসান শরীফ, নিউইয়র্কের বিশেষ প্রতিনিধি শামসুল আলম লিটন, বাণিজ্যিক উপদেষ্টা হেলিম আহমদ, নবযুগের ডিজাইন ও মুদ্রণ বিভাগের প্রধান ওসমান সৈকত, নবযুগ ডিজিটাল বিভাগের প্রধান এইউ প্রিন্স, সহযোগি সম্পাদক ইশিতা, নিউইয়র্কের নির্বাহী সম্পাদক আহাসানুল হক পলাশের প্রতি। শামসুল আলম লিটন না হলে করোনাকালীন নবযুগ মানুষের কাছে পৌঁছানো দুরহ হয়ে যেতো। কারণ আমি আর শামসুল আলম লিটন মিলেই করোনার ভয়কে উপেক্ষা করে কমিউনিটির সবখানে নবযুগ পৌঁছে দিয়েছি এবং মানুষের ছাপা পত্রিকার ক্ষুধা মিঠাতে পেরেছি। হেলিম আহমদ করোনাকালীন দায়িত্ব নিয়ে নবযুগকে বিজ্ঞাপনসহ অর্থনৈতিকভাবে সহযোগিতার গুরু দায়িত্ব পালন করেছেন। আর শামসুন নাহার নিম্মি পুরো নবযুগকে কঠিন হাতে পরিচালনা করেছেন গেল ছয় বছর। আমি স্মরণ করছি নবযুগ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত যারা শ্রম আর মেধা দিয়ে আমাদের টিমে কাজ করছেন তাদের প্রত্যেককে।
আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি গেল ছয় বছরে নবযুগ কমিউনিটিতে বহু নতুন নতুন লেখক, কবি ও সাহিত্যিককে লেখা-লেখির অবারিত সুযোগ দিয়েছে। পাশাপাশি অভিজ্ঞ ও দক্ষ লেখক, কবি এবং সাহিত্যিককেও দিয়েছে তাদের যোগ্য মর্যাদা। যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। সপ্তমবর্ষে পদাপর্ণ করতে গিয়ে আমরা হয়তো পাঠকের পুরোপুরি প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি কিন্তু আমরা ব্যর্থ নই, কারণ আমরা সব সময় ‘ভয়কে জয়’ করেই সামনে এগিয়েছি যা আমাদের ভবিষ্যৎ সংকল্পও। আজকের এই দিনে নবযুগ ঢাকা এবং নিউইয়র্ক টিম, লেখক, পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা সংশ্লিষ্ট সবাইকে শ্রদ্ধার সঙ্গে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা।
-সম্পাদক

















