বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪

সাপ্তাহিক নবযুগ :: Weekly Nobojug

খাইরুল ইসলাম পাখি’র কিচিরমিচির-চার

নিউইয়র্কে সময় রক্ষা না করা, এক ব্যামো

খাইরুল ইসলাম পাখি

আপডেট: ২৩:০৭, ২৬ জানুয়ারি ২০২৪

নিউইয়র্কে সময় রক্ষা না করা, এক ব্যামো

খাইরুল ইসলাম পাখি

যে কোনো কাজে দেরি করা এক বদ অভ্যাস। কোন অনুষ্ঠানে দেরি করে উপস্থিত হওয়া কিংবা দেরিতে অনুষ্ঠান শুরু করা, এক বদ অভ্যাস। তা যে কোনো কাজের ক্ষেত্রেই হোক না কেন। তবে সত্যি সত্যি কোন ইমারজেন্সি হলে সে কথা আলাদা। আজকাল বিয়ে বাড়ি বলুন আর খাৎনা উৎসবই বলুন, যেকোনো সামাজিক আর বিনোদন অনুষ্ঠানই বলুন, সমস্ত অনুষ্ঠানেই দেরি করে উপস্থিত হওয়া বা অনুষ্ঠান দেরীতে শুরু করা এক নিয়ম বা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। অনেকে ভাবেন দেরি করে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া একটা ভাব। কিন্তু অনেকে যে তাকে ডাব বা গাব ভাবতে পারেন, সেটা আর ভাবেন না। আর যারা আয়োজক, অনেক ক্ষেত্রে তাদের অবহেলাও উল্লেখযোগ্য। একপক্ষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। দুই পক্ষই যেন পাল্লা দিয়ে দেরী দেরী খেলেন! এসব ঘটনা খুব কমন বিশেষ করে আমাদের বাঙালি সমাজে। ফ্রি কোন অনুষ্ঠানে এ চর্চা আরো বেশি চোখে পড়ে। ‘ফ্রি’ তো দেরি করলে  ক্ষতি কি?

অনেক সময় আয়োজকরা ভাবেন সময় ৫টা বলেছিতো কি হয়েছে মানুষ তো দেরি করবেই। এমন ভাবনা থেকেও গড়িমসি করতে করতে অনুষ্ঠান দেরিতে শুরু হয়। কারো যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সবাই একটা গা ছাড়া ভাব। নিয়ম ভাঙ্গাই যেন এক অদ্ভূত নিয়মে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু সভ্য সমাজে এটা বিরল। যেখানে সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই বলে আবার কেউ এই ভেবে গায়ে ফোসকা উঠাবেন না যে, আমরা অসভ্য জাতি! আমিবা কোন দুঃখে খোদ নিজের সম্পর্কে এমনটা বলতে যাব! অন্যদিকে খেয়াল করে দেখুন, অনুষ্ঠানাদিতে অন্তত ৫ থেকে ১০ শতকরা লোক সময় মতো পৌঁছায়। সে ক্ষেত্রেও বিপত্তি। অনেকে তাদের পানে এমনভাবে তাকায়, যেন সময় রক্ষা করে তারা অন্যায় করেছেন! সময়মতো উপস্থিত হয়ে তারাও ধৈর্য হারা হতে থাকেন ক্রমে ক্রমে। কি করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। তাই পরবর্তীতে যারা সময়ানুবর্তী ছিলেন তারাও সময় রক্ষায় ধীরে ধীরে আগ্রহ হারাতে থাকেন।

এই নিউইয়র্ক শহরে বাঙালিদের বসবাস শুরু হয় বহু বছর আগে। জগত বিখ্যাত এই শহরের সব কিছুই নিয়ম বা সময় মত চললেও, আমাদের কমিউনিটির যেকোনো ধরনের অনুষ্ঠান সময় মত শুরু হওয়ার নিয়মটা আমরা ভাঙতে ভাঙতে তলানিতে নিয়ে গেছি। আর যারা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তারাও কম যান না। ধরুন গান নিয়ে যে শিল্পী মঞ্চে ওঠার কথা ৫টায় সে উঠলেন দু‘তিন ঘন্টা পরে। ততক্ষণে মানুষের জান ওষ্ঠাগত। বিশেষ করে যে বেচারারা সময়মতো উপস্থিত হন। আর যারা দেরি করে আসেন তাদের কল-কাকলিতে অনুষ্ঠান স্থল আরো অরাজক হয়ে ওঠে। যার ফলে তাদের কারণেও অনুষ্ঠান শুরু হতে দেরি হয় বৈকি! কিন্তু এই নিয়ে দেরি-কুলের বিন্দুমাত্র অনুতাপ নেই। আবার এই এরাই যদি পয়সা খরচ করে টিকিট করে কোন অনুষ্ঠান দেখতে যান, তবে সময় বিষয়ে অনেক সচেতন হয়ে যান। কোন বৈধ কারণেও যদি আয়োজকরা অনুষ্ঠান শুরু করতে কাল বিলম্ব করেন, তবে আয়োজকদের গুষ্টি উদ্ধারে তারা কিন্তু কার্পন্য করেন না। আবার অনেকে টিকিট করেও ভেবে নেন আধঘন্টা পরে গেলেও সমস্যা নেই। অনুষ্ঠানতো সময় মতো শুরু হবে না। এমন ভেবেও দেরি করেন কেউ কেউ, তখন গুরুত্বপূর্ণ কিছু থেকে বঞ্চিতও হন কখনো কখনো।

উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি আমার নিজের অভিজ্ঞতাই তুলে ধরছি। ইতোমধ্যে আপনারা হয়তো ‘পেন্ডুলাম’ নাটকের কথা শুনেছেন। গত বছরের মে মাসে নাটকটির প্রথম শো হয় নিউইয়র্ক-এ। এ যাবত ৮টি শো হয়েছে। ৫টি শো ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে ঠিক সময়ে শুরু হয়েছিল। ২টি শো মাত্র ৫ মিনিট দেরি করে আর ১টি শো হয়েছিল ১০ মিনিট দেরি করে। সেটিও হয়েছিল প্রচন্ড ঝড় ও বৃষ্টির কারণে। তবে সব ক‘টি শোতেই কেউ কেউ দেরিতে উপস্থিত হওয়ায়, শুরু থেকে নাটক উপভোগে নিজেকে বঞ্চিতও করেছেন। অনেকে বলেছেন এমন সময়মত শুরু হবে ভাবেননি। আর কেউ হয়তো সঙ্গত কোন কারনেই সময়ে হাজির হতে ব্যর্থ হয়েছেন। আমাদের এই শহরে প্রায় প্রতিদিনই বাঙালি কমিউনিটিতে কোনো না কোনো অনুষ্ঠান লেগেই আছে। আর বন্ধের দিনেতো অনুষ্ঠানের জ্যাম লেগে যায়। মিলাদ থেকে শুরু করে পিঠা উৎসব অনুষ্ঠান, কিছুই বাদ নেই। চলে পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানও। মানুষের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মত এসব অনুষ্ঠানে। বিশেষ করে যে অনুষ্ঠানে ফ্রিতে ঢোকা যায় কিংবা ফ্রি ভুরিভোজ চলে, সেটা জমে আরও বেশি। এসব অনেক অনুষ্ঠানে দেরি করে উপস্থিত হওয়ার বদ অভ্যাস যেন অনেকেই আসক্ত করে ফেলেছে।

অনেক ক্ষেত্রে নিরুপায় আয়োজকরাও। দেখা গেল অনুষ্ঠানের স্পনসরগন সাজগোজ আর গোঁফে তেল দিতে দিতে সময়কে করে তোলেন অসময়। যথাসময়ে উপস্থিত হওয়া অনেককেই ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে দেখতে হয় আর বেদনা বিধুর হয়ে ভাবতে হয়, কখন আসবে কবি! অবশেষে ঠাকুর ডুবিয়ে কবির উদয় হয়। তারপর শুরু হয়  বক্তৃতা আর কচকচানি। সেলফি আর শুটিং। সেসব চলে ধৈর্য্যের কাছি না ছেঁড়া অব্দি। কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই-দায় নেই সময় রক্ষার। এ এক দুঃখজনক সংস্কৃতি আমরা এই উন্নত বিশ্বেও বহাল রেখেছি। আমাদের ঐতিহ্যকে আমরা ধরে রেখেছি শক্তপোক্ত করে।

একজন আয়োজক হতাশ মুখে জানালেন, স্পন্সরগণ আয়োজকদের মতামতের গুরুত্ব দিলে যদি অনুষ্ঠানের সময় ও মান ধরে রাখা যায়, তাতে প্রকারান্তরে স্পন্সরদেরইতো লাভ হয়।এই সত্যটা তাদের উপলব্ধিতে আসা জরুরি। সময় ক্ষেপণে মানুষ যে বিরক্ত হয় এমন সহজ কথাটা মহাশয়েরা কবে বুঝবেন জানিনা।

এই শহরের আরো একজন প্রোমোটার জানালেন, অনুষ্ঠানের স্বার্থে তাদের অনেক পরিকল্পনাই ভেস্তে যায় মহামতি স্পন্সরদের নানান অনুরোধ আর চাহিদা মেটাতে। সময় রক্ষা করার বিষয়টাও সেভাবেই বিঘিœত হয়। অথচ সব পক্ষই যদি সময় রক্ষার বিষয়টা আন্তরিকভাবে বিবেচনায় আনেন এবং যদি এখন থেকে চর্চায় আনেন, তবে এই ভঙ্গুর ঐতিহ্য ভাঙ্গা সম্ভব। তাহলে নিউইয়র্ক শহর থেকে অচিরেই এই ‘অসময়‘ ব্যামোটি দূর হতে পারে এবং তারপর থেকে নিউইয়র্কও হতে পারে অন্যদের জন্য নিয়ামক দৃষ্টান্ত। এ ব্যাপারে আয়োজকরা এবং যদি উদ্যোগী ও সচেতন হন, তবে আশা করি দর্শক শ্রোতারা ও আম জনতা তা মানবেন কিংবা সময়ে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। যখন দেরিতে যেয়ে দেখবেন অনুষ্ঠান অর্ধেক বা শেষ পর্যায়ে, তখন টনক নড়বে হয়তো। আর অনুষ্ঠানে খাওয়া-দাওয়া যদি যথা সময় পরিবেশন করা হয় তাহলে তো কথাই নেই, পেট পূর্তির জন্য হলেও তখন অনেকে সময় মেনে চলবেন।

তার উপর একটা সময়ের পরে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে এমন আগাম ঘোষণা দেয়া থাকলে দেরী করা বিষয়টা কমে আসতে পারে।
আজকের মত সময়ের এই কচকচানি সময়মতোই শেষ করি। নতুবা দেখা গেল এই লেখা পড়তে যেয়েই কোন পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে পৌঁছাতে আপনার আবার দেরি হল, আর আপনিও পুরস্কার হারালেন এবং আপনাকে না পেয়ে যেটা অন্যকে দিয়ে দেওয়া হলো। আমারও সেটা কাম্য নয়। আসুন সবাই মিলে চেষ্টা করে সময়ের অনুষ্ঠান সময়ে শুরু করি। দশটার অনুষ্ঠান যেন দশটায়ই শুরু হয়। দশটার কথা দিয়ে বারোটায় শুরু করে সবকিছুর বারোটা না বাজাই। নিজেকে বা নিজেদের এই মর্মে নব রূপে উদ্যোগি করি আর ভাবতে শিখি ন’টার গাড়ি কিংবা ন’টার উড়োজাহাজ ন’টায়ই ছাড়ে। ওই প্রাণবোধহীন যানবাহনগুলো যদি সময় মেনে চলে তবে আমরা কেন তা পারবো না বলুন?!

শেয়ার করুন: