শনিবার, ২৮ জানুয়ারি ২০২৩

সাপ্তাহিক নবযুগ :: Weekly Nobojug

শহীদ জিয়ার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী

তোমার শরীর থেকে আসে মাটির সুবাস 

প্রফেসর ড. মোর্শেদ হাসান খান

প্রকাশিত: ১০:২৩, ২০ জানুয়ারি ২০২৩

তোমার শরীর থেকে আসে মাটির সুবাস 

ফাইল ছবি

ছোটো বেলায় একটি নাম শুনলে যেন বাংলাদেশের ছবি দেখতে পেতাম। লোকটাকে চিনতাম না। তার সম্পর্কে জানতাম না তেমন কিছুই। গ্রামের মানুষের মুখে শুনতাম। মাঠে ফসলের ক্ষেতে, নদীর স্বচ্ছ জলে, বনানীর সুউচ্চ গাছের শাখায়, পাখির কলরবে, ভোরের শিশিরের মতো টলটলে উজ্জ্বল সে নাম। হৃদয়ের গহীনে যার অবয়ব, দু’চোখ বুজলে সাদা হাফ হাতার গেঞ্জি, গোল ফ্রেমের সানগ্লাসের নিচে বাঁশির মতো মাঝারি নাকের নিচে কাঁচা-পাকা গোফ, এ যেন একজন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। গ্রামে-গঞ্জে সাধারণ মানুষের ভীড়ে মিশে থাকা একজন অসাধারণ মানুষ। একজন বিপ্লবী, একজন রনাঙ্গণের বীর, একজন আধুনিক রুচি সম্পন্ন স্বপ্ন বিলাসী রাষ্ট্র নায়ক। তিনি আর কেউ নন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আমাদের শৈশব-কৈশরের আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর সংগ্রামের নাম। 

আজ তার ৮৭তম শুভ জন্মদিন। ১৯৩৬ সালের ১৯ জানয়ারি জিয়াউর রহমান বগুড়া জেলার বাগবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তার ডাক নাম ছিলো কমল। পিতার চাকরির কারণে জিয়াউর রহমান কলকাতা হেয়ার স্কুলে লেখাপড়া করেন। ভারতবর্ষ ভাগের পর তার পিতা সপরিবারে পাকিস্তানের করাচিতে চলে গেলে তখন জিয়াউর রহমান করাচি একাডেমী স্কুলে ভর্তি হন।

করাচি একাডেমী থেকে তিনি ১৯৫২ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ১৯৫৩ সালে করাচিতে ডি.জে. কলেজে ভর্তি হন। একই বছর তিনি কাকুল মিলিটারি একাডেমীতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি কাকুল পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন প্রাপ্ত হন।

সামরিক বাহিনীতে তিনি একজন সুদক্ষ প্যারাট্রুুপার ও কমান্ডো হিসেবে সুপরিচিতি লাভ করেন এবং স্পেশাল ইন্টেলিজেন্স কোর্সে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। করাচীতে দুই বছর চাকুরি করার পর ১৯৫৭ সালে তিনি ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হয়ে আসেন। তিনি ১৯৫৯  থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন।

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে খেমকারান সেক্টরে তিনি অসীম বীরত্বের পরিচয় দেন। এই যুদ্ধে বীরত্বের জন্য পাকিস্তান সরকার জিয়াউর রহমানকে হিলাল-ই-জুরাত  খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৬৯ সালে মেজর পদে উন্নীত হয়ে জিয়াউর রহমান জয়দেবপুরে সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদের দায়িত্ব লাভ করেন। এডভান্সড মিলিটারি এন্ড কমান্ড  ট্রেনিং কোর্সে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য তিনি পশ্চিম জার্মানিতে যান এবং কয়েক মাস ব্রিটিশ আর্মির সাথেও কাজ করেন।

১৯৭০ সালে একজন মেজর হিসেবে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রামে নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড পদের দায়িত্ব লাভ করেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে প্রথমে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার নিযুক্ত হন এবং চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, রাঙ্গামাটি, মিরসরাই, রামগড়, ফেনী প্রভৃতি স্থানে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। জুন হতে অক্টোবর পর্যন্ত যুগপৎ ১১ নম্বর  সেক্টরের  ও  জেড-ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডের পর দেশ এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হয়। তখন জিয়াউর রহমান দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। এরপর ৭৬ সালে তিনি তার উত্তরসুরী রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত সায়েমের স্থলাভিষিক্ত হন। এরপরের গল্প একটি প্রগতিশীল বাংলাদেশের। একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে একজন ভিশনারী নায়কের দিনরাত ছুটে চলার গল্প। এরপরের গল্প ৫৬ হাজার বর্গ মাইলের এই সুজলা-সুফলা ভুখন্ডকে ঢেলে সাজানোর গল্প। যেই গল্প পড়েই আমাদের বেড়ে ওঠা। আমাদের রাজনীতির বোধের বিকাশ। 

স্বাধীন বাংলাদেশের পূর্বের প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান এবং পরের শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য সেটি যে কেউ সহজেই বুঝতে পারে। তাই রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান তার শাসনামল শুরু করেন একটি ভারসাম্যহীন রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়ে। যেখানে বাক স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ কিংবা ক্ষমতার ভারসাম্য ছিলো না। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে ছিলো সুস্পস্ট কোনো পরিকল্পনা। কৃষি নির্ভর বাংলাদেশে হলে ছিলো কৃষির আধুনিকায়ন করার কোনো স্বপ্ন কিংবা লক্ষ্য। শিল্পবিপ্লবের ঢেউ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে লাগলেও বাংলাদেশে তার ছিটেফোটাও লাগেনি। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে আসেনি রাষ্ট্র ব্যবস্থা। সবমিলে বাংলাদেশ তখন একটি সর্বরোগে পীড়িত এক শিশু। সেই শিশুকে লালন-পালনের কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কাধে তুলে নেন একজন সমর নায়ক।

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেই রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নিলেন। গণতন্ত্রকে পুনর্জ্জীবিত করলেন। আওয়ামী লীগসহ সকল দলকে মুক্তভাবে রাজনীতি করার সুযোগ দিলেন। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিলেন। বাক স্বাধীনতাকে শৃঙ্খলমুক্ত করে সকল দল ও মতের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় সবার মতামত ও অংশগ্রহণকে প্রাধান্য দিয়ে একটি অংশগ্রহণমূলক সরকার ব্যবস্থা কায়েম করলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এই উর্বর ভূখন্ডে সমৃদ্ধি আনতে হলে কৃষিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাই তিনি কৃষিকে আধুনিকায়নের ফর্মুলা বাতলালেন। সারা দেশে প্রাকৃতিক সেচ ব্যবস্থা কার্যকরের জন্য খাল খনন প্রকল্প নিয়ে ছুটে গেলেন দেশের প্রতিটি গ্রামে। জনগণের সঙ্গে মিলে নিজে হাতে কোদাল নিয়ে মাটি কাটতে নেমে গেলেন।

তার এই আন্তরিক প্রচেষ্টা সারাদেশের মানুষের মধ্যে অভূতপূর্ব সাড়া ফেললো। রাতারাতি কৃষিতে বিপ্লব সাধিত হলো। মানুষে ফল-ফসলের নাম করলেন করতে শুরু করলেন জিয়ার নামে। মানুষের এই ভালোবাসা নিয়েই খুবই অল্প সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারে সফল হলেন একজন আধুনিক মননের রাষ্ট্রপতি। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি হয়ে উঠলেন আইডল। তিনি এই বাংলারই সন্তান। গ্রামের সোদা মাটির গন্ধ তার শরীরে। এই বাংলাদেশেরই তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন। এই বাংলাতেই তিনি তার জীবনের শুরু ও শেষ দেখতে চেয়েছিলেন। তাইতো তার কাছে অসম্ভব প্রিয় ছিলো ‘প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ-জীবন বাংলাদেশ, আমার মরণ বাংলাদেশ’ সঙ্গীতটি। তিনি এই সঙ্গীতকে তার গড়া দল বিএনপি দলীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করলেন। তিনি যেন বিমোহিত হতেন এর সুর সঙ্গীতে। তিনি উজ্জীবীত হতেন গানের প্রতিটি কথায়, প্রতিটি ছন্দে। 

শৈশব-কৈশরে বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে, ব্রিজ-কালভার্টের রেলিংয়ে শহীদ জিয়ার প্রতিকৃতি দেখতাম। অপলক তাকিয়ে থাকতাম। কি করে এতো অল্প সময়ে সৈনিক থেকে একজন অসম্ভব জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি হলেন তিনি পরবর্তীতে সেই হিসেব মিলেছে। আসলে সাধারণ মানুষের স্বপ্নকে যিনি  নিজের স্বপ্ন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন তিনিই তো হবেন সাধারণের মধ্যে অনন্য সাধারণ। মাটি আর মানুষের জন্য যে জীবন ছিলো নিবেদিত মৃত্যু কিংবা প্রস্থান তার জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি তার আদর্শে, জীবন দর্শনে আর আধুনিক মনন আর চিন্তায় বেঁচে আছেন কোটি কোটি মানুষের মধ্যে। তার রাষ্ট্র পরিচালনার মডেল আজো বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। তাইতো তারই সুযোগ্য সন্তান ভবিষ্যত বাংলাদেশের কর্নধার তারেক রহমান রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন। আগামীর বাংলাদেশ হবে সাধারণ জনগণের। আর একে সংস্কারে দায়িত্ব নিয়েছেন  দেশ নায়ক তারেক রহমান। তার এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে সবার। আমরা সেই সুযোগই লুফে নিব। 

লেখক: মহাসচিব, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি টিচার্স এসোসিয়েশন-ইউট্যাব। 
 

শেয়ার করুন: