মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২

সাপ্তাহিক নবযুগ :: Weekly Nobojug

নভেম্বর বিপ্লব- নতুন ভাবনার উপকরণ

সুব্রত বিশ্বাস, সভাপতি- যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশিত: ২৩:১৩, ১২ নভেম্বর ২০২২

নভেম্বর বিপ্লব- নতুন ভাবনার উপকরণ

প্রতিকী ছবি

বিংশ শতাব্দীর সর্বাদিক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নভেম্বর বিপ্লব। সকলেই অবহিত যে, এই বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল রাশিয়ায়। বিশে^ বুকে প্রথম সফল সর্বহারা বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠেছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। সর্বহারা শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্বে বিশে^ প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে। শ্রমিক-কৃষক সব শোষিত, বঞ্চিত মানুষের অধিকার স্বার্থরক্ষার নতুন নজির গড়ল সর্ভহারার রাষ্ট্র। উন্নয়নের এক অভূতপূর্ব নজির উপস্থিত করল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অবসান ঘটালো সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। স্মরণ রাখতে হবে জার শাসিত রাশিয়া ছিল ইউরোপীয় পুঁজিবাদের পশ্চাৎপদ দেশ। সর্বহারা বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশেই পৃথিবীর বুকে প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটল।

মার্কসীয় মতবাদ যা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতবাদের তত্ত্ব উপস্থিত করল, সেখানে পুঁজিবাদের উদ্ভব সমাজব্যবস্থা অর্থাৎ সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ বিকাশের দেশেই সম্ভব হবে বলে ধারণা থাকলেও ঘটনা ঠিক সেভাবে ঘটল না। মার্কসবাদের প্রতিষ্ঠাতা কার্ল মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলস পুঁজি পুঁজিবাদের বিকাশধারাকে বিশ্লেষণ করেই সমাজতন্ত্রের অনিবার্যতা সমাজতন্ত্রের মধ্য দিয়ে সাম্যবাদের স্তরে মানব সমাজের উত্তরণের কথা তুলে ধরেন। øাদিমির ইলিচ লেনিন মার্কস  এঙ্গেলস পরবর্তী সময়ে পুঁজিবাদের বিকাশ, সা¤্রাজ্যবাদের স্তরে তার উত্তরণ-এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন। সমগ্র পরিস্থিতি বিচার করে কমরেড লেনিন বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষের দিকে (১৯১৭) রুশ দেশেই বিশে^ প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্ভবের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। সম্ভাবনা তুলে ধরেই ক্ষান্ত হলেন না, সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বের নভেম্বর বিপ্লব সফল করে বিশে^ প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলেন।

মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের মৃত্যু হয় যথাক্রমে ১৮৮৩ ১৮৯৫ সালে। পুঁজিবাদের বিকাশের ধারায় একচেটিয়া পুঁজিবাদের উদ্ভবের সম্ভাবনার কথা মার্কসই তুলে ধরেছিলেন। তবে সা¤্রাজ্যবাদ ইউরোপ মহাদেশেই প্রথম গড়ে ওঠে বিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরু থেকে। সেই সময়ে লেনিন রুশ দেশে মার্কসবাদের প্রয়োগে সর্বহারা বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ করছিলেন। লেনিন দেখলেন যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার দ্বন্দ্বগুলো তীব্রতর হয় সা¤্রাজ্যবাদের যুগে। সা¤্রাজ্যবাদের বৈশিষ্ট আলোচনা করতে গিয়ে লেনিন দেখলেন সা¤্রাজ্যবাদের যুগে একচেটিয়া আধিপত্য লগ্নীপুঁজি আর্বিভাব ঘটে। পুঁজির রপ্তাপি যেমন গুরুত্ব পায় আবার একচেটিয়ারা নিজেদের বাজার আধিপত্য স্থাপন করতে দুনিয়াটাকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। সা¤্রাজ্যবাদী দেশগুলো নিজেদের মতো করে বাজার ভাগাভাগি করে। নতুন উত্থিত শক্তি সেই বাজারে ভাগ বসাতে গেলে সংঘাত, যুদ্ধ শুরু হয়। সাম্্রাজ্যবাদী যুগে বাজার দখলের প্রশ্নে যুদ্ধ অনিবার্য।

১৯১৭ সালে রুশ দেশের মাটিতে সংঘটিত নভেম্বর বিপ্লবের বার্তা সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। পুঁজিবাদ-সা¤্রাজ্যবাদের পক্ষ থেকে এই বিপ্লবের বিরুদ্ধে নানা কুৎসা ছড়ানো হলেও নভেম্বর বিপ্লবকে ব্যর্থ করার জন্য দুনিয়ার সা¤্রাজ্যবাদীদের পক্ষ থেকে রুশ দেশে সমস্ত প্রতি বিপ্লবী শক্তিকে উৎসাহিত মদত দেওয়া হলো। প্রতি বিপ্লবের প্রয়াসকে রুখে দিল বলশেভিক পার্টি, লালফৌাজ রুশ-শ্রমিক, কৃষক জনগণ। বিপ্লবকে রক্ষা করার কাজ শুরু হলো, বিশে^ প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নকে গড়ে তোলার ঐতিহাসিক সংগ্রাম। পশ্চাদপদ পুঁজিবাদী দেশ ছিল বিপ্লবপূর্ব রুশ দেশ। সেই দেশের সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার যাত্রাপথ মোটেই মৃশৃণ ছিল না। প্রথম বিশ^যুদ্ধে সামরিক, অর্থনৈতিক সংগ্রাম বিশে^ জনগণের প্রশংসা অর্জন করল। নভেম্বর বিপ্লবের বজ্য নির্ঘোাষ মার্কসবাদের বার্তা সমগ্র বিশে^ ছড়িয়ে দিল।

মার্কসীয় মতবাদের বার্তা পৌঁছানোর সাথে সাথে শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী পার্টি কমিউনিস্ট পার্টিগুলো বিশে^ দেশে দেশে গড়ে উঠতে থাকল। ভারত, চীন, ইন্দো-চীন এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কমিউনিস্ট পার্টিগুলো গড়ে উঠল। শ্রমিক, কৃষক সহ মেহনতি শোষিত জনগণ পরাধীন দেশের মানুষ তাদের সংগ্রামের মতাদর্শগত অধিকারের সন্ধান পেয়ে নতুন উদ্যমে তাদের লড়াই শুরু করেন।

ভারতে ১৯২০ সালে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠল। নভেম্বর বিপ্লবের দেশ সোভিয়েত ভূমিতে তাসখন্দ শহরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে উঠল অত্যন্ত দ্রুতবেগে ভারতের মাটিতে পার্টি কার্যধারা প্রসারিত হতে শুরু করল। মার্কসীয় বিপ্লবী মতবাদের দ্বারা পরিচালিত পার্টি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে পূর্ণ স্বাধীনতার সঠিক দাবি যেমন প্রথম তুলে ধরল, আবার শ্রমিক-কৃষক সহ জনগণকে এই সংগ্রামের ধারার সঙ্গে যুক্ত করল। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারত গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ শোষণহীন ভারত যা সমগ্র জনগণের আর্ত-সামাজিক অগ্রগতির লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে-এই কথা স্পষ্টভাবে উপস্থিত করল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। স্বাধীনতার পর মার্কসীয় মতবাদের ভিত্তিতে ভারতে বিপ্লবের কর্মসূচি উপস্থিত করে পরিস্থিতি অনুযায়ী রণকৌশল তৈরি করে শ্রেণি শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন তথা গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে শক্তিশালী করে ভারতীয় সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্যে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি কাজ করে।

একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে আমরা প্রবেশ করছি। বিশ^ায়িত আন্তর্জাতিক লগ্নীপুঁজির আগ্রাসন আমরা প্রত্যক্ষ করছি। পুঁজিবাদী দুনিয়ায় চরম দক্ষিণপন্থার কার্যধারা ক্রমন্বয়ে প্রসারিত হচ্ছে। ইতালির নির্ভাচনেও ফ্যাসিবাদী শক্তির ক্ষমতায় আসীন হওয়া আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। এহেন পরিস্তিতিতে লাতিন আমেরিকায় ব্রাজিলের নির্বাচনে লুলা ডি সিলভারের বিজয় এক ঐতিহাসিক ঘটনা। তার পরক্ষণে নেদারল্যান্ডে বামপন্থার বিজয় সব মিলে সমগ্র বিশে^ নুতন করে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। চরম দক্ষিণপন্থা তথা ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনকে রুখে দিয়ে বামপন্থীদের ঐকবদ্ধ সংগ্যামের সাফল্যের প্রতীক ব্রাজিলের লুলা তথা বামপন্থীদের বিজয়। বামপন্থী বিকল্প যা শোষণহীন সমাজব্যবস্থার ইঙ্গিত বহন করে সেটাই ব্রাজিলে পুর্বেকার লুলা সরকার স্থাপন করেছিল। মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদ চরম দক্ষিণপন্থী বহু ষড়যন্ত্র, আক্রমণ মোকাবিলা করে ব্রাজিলের এবারের নির্বাচনে লুলার বিজয় এক ঐতিহাসিক ঘটনা।

বিশে^ সমস্ত সামাজিক দ্বন্দ্বগুলো তীক্ষèতর হচ্ছে। অভাব, দারিদ্র, বেকারি লুণ্ঠন, শোষণের অবসান ঘটিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা, সকলের সমান অধিকারের দুনিয়া, মানবতার প্রকৃত মর্যাদা রক্ষা, জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সম্ভব হবে সেই লক্ষ্যে সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা। আজ সমগ্র বিশে^ অনেক বেশি করে মানুষের কাছে অনুভত হতে শুরু করেছে। নভেম্বর বিপ্লবেই প্রথম বিশ^বাসীর সামনে উন্নত, সমৃদ্ধ, শোষণহীন দুনিয়া প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করেছে। বিকল্পের সঠিক দিশা দিয়েছে। নভেম্বর বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব আজ নেই, কিন্তু নভেম্বর বিপ্লবের শিক্ষা, আবেদন, বিকল্পের বাস্তবতা উপিস্থত করা তথা ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে অস্বীকার করবে? নভেম্বর বিপ্লবের সুমহান ঐহিহ্যকে স্মরণে রেখেই একবিংশ শতাব্দীতে শ্রমজীবী জনগণকে পুঁিজিবাদ সা¤্রাজ্যবাদের বিকল্প অর্থাৎ সমাজতন্ত্র স্থাপনের লক্ষ্যে অগ্রসর হতেই হবে। এটাই আজকের বিশে^ দাবি প্রত্যাশা।

শেয়ার করুন: