মঙ্গলবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২২

সাপ্তাহিক নবযুগ :: Weekly Nobojug

আবারো শুরু হলো ‘ঢাকার চিঠি’

দামের রাজা ইলিশ

মেসবাহ শিমুল, ঢাকা প্রধান-নবযুগ

আপডেট: ১৭:৫৯, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২২

দামের রাজা ইলিশ

ঢাকার চিঠির লেখক: মেসবাহ শিমুল

মাছের রাজা ইলিশ এই প্রবাদ অনেক পূরণো। নতুন করে প্রবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে দামের রাজা ইলিশ। আশা করি নতুন এই প্রবাদ নিয়ে কারো কোনো দ্বিমত নেই। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে আমাদের এই জাতীয় মাছের দাম। বিগত বেশ কিছু বছর এই মাছটি সাধারণ মানুষের নাগালে থাকলেও হঠাৎ করেই সেটি আমাদের সাধ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তবে সীমান্ত পেরিয়ে আমাদের প্রতিবেশি দেশটির জনগণ সেটি খেতে পারছে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে।

 

মঙ্গলবার রাজধানীর খিলগাঁও রেলগেট বাজারে ঘুরলাম। মোটামুটি কম দামে মাছের জন্য এই যায়গাটা বিখ্যাত। তবে এই খ্যাতিটা যে ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে সেটি আমার জানা ছিলো না। এখানকার ইলিশগুলো সাইজে বড়। দামও চড়া। কেজি ১২শ টাকা থেকে শুরু। কিছুক্ষণ দেখেশুনে চলে এলাম। রাস্তায় হাটতে হাটতে এই লেখাটির চিন্তা। যদিও এই সপ্তাহে অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ লেখার বিষয় ছিলো।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফর শেষ হয়েছে গেলো সপ্তাহে। এই সফরের অর্জণ কিংবা বিসর্জন নিয়ে হয়তো অনেকেই অনেক কিছু বলছেন। আমি সেদিকে যাচ্ছি না। তবে তার সফরকাল এবং পরবর্তী সময়ে ভারতে আড়াই হাজার মেট্রিকটন ইলিশ রপ্তানির কথা খবরে দেখলাম। দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে এই মাছ ভারতে যাচ্ছে এমনই নাকি বিয়ষটা। এ নিয়ে শেখ হাসিনা বেশ প্রশংসিত হচ্ছেন ভারতে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মাছ বাজারে শেখ হাসিনার নামে দুয়ো উঠছে। দেশের মানুষের কাছে বিষয়টি বিতর্কিত হলেও সেখানকার মানুষের কাছে এটি প্রশংসার। 

সম্প্রতি একটি একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটি কলকাতার কোনো এক মাছ বাজারের। সেখানকার একজন মাছ বিক্রেতা ৫শ টাকায় ইলিশ বিক্রি করছেন। বেশ উৎসাহের সঙ্গে ডেকে ডেকে। তার মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জোরালো প্রশংসা শুনে মনে মনে আন্দোলিত হয়েছি। দেশে দলীয় কর্মীদের বাইরে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমনটি দেখা যায় না। যেটি ওই মাছ বিক্রেতা দেখিয়েছেন।

ইলিশ মাছ আমরা এর আগেও ভারতে পাঠিয়েছি। রপ্তানি কিংবা উপহার, দুই ফরমেটেই। তবে এবারের মতো এতো বিশাল পরিমানে নিশ্চয়ই এর আগে কখনো যায়নি। যায়নি বলে কি যাবে না? তাই এবার যাচ্ছে। দেশের বাজারে ইলিশের যখন আকাশ ছোঁয়া দাম সে সময়ে ভারতে আমাদেরই ইলিশ কি করে কম দামে বিক্রি হচ্ছে এ প্রশ্নের কোনো উত্তর পাচ্ছি না।

খবরে দেখছি এ বছর সাগরে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে। টেলিভিশের পর্দায় সে খবর দেখে অনেকেই খুশি হচ্ছেন। কিন্তু বাজারে গিয়ে আর সে খুশি থাকছে না। চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাট কিংভা কুয়াকাটার মহীপুর ফিশারি ঘাটের চিত্রের সঙ্গে কোনোভাবেই মিলছে না বাজারের চিত্র। তবে কেন এই তফাৎ। এর পেছনে কারা আসলে কলকাঠি নাড়ছে?

করোনকাল থেকেই দেশে নিত্যাপণ্যের বাজার সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। গত দুই-তিন বছরে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কোন পর্যায়ে নেমে এসেছে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। একটি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলের একটি প্রতিবেদন দেখলাম সেখানে কয়েকটি মধ্যবিত্ত পরিবারের গল্প উঠে এসেছে। কিছুদিন আগেও যে পরিবারটি মোটামুটি খেয়ে পরে সাচ্ছ্বন্দ্যে ছিলো সেই পরিবারে আজ হাহাকারের গল্প। যে ফ্রিজে আগে মাছ-মাংস,ফলমুল দিয়ে ভরা থাকতো সেখানে এখন বোতল ভরা খাবার পানি। ফ্রিজের কুলিং সিস্টেম ঠিক রাখতে এই বিকল্প উপায়। একজন মা বলছেন, ‘আমার মেয়েটা লাল শাক খেতে চেয়েছে। আমি প্রতিদিন বাজারেও যাই। কিন্তু দাম দেখে আর কেনা হয় না। ঘুরে চলে আসি।’ এই গল্পটা হয়তো ছোট্ট কিন্তু বড় ধরণের একটা শুন্যতা রয়েছে এর মধ্যে। হাহাকারের এই গল্পগুলো এখন প্রায় প্রতিটি ঘরেই রয়েছে। কেউ বলছে, আবার কেউ চেষ্টা করছে যতদিন না বলে থাকা যায়।

বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদন দেখে সেদিন বেশ আতঙ্কিত ও ব্যথিত হলাম। প্রতিবেদনটি মেসে বসবাসকারী স্টুডেন্টদের নিয়ে করা। সেখানে ইডেন কলেজের একটি মেয়ের সাক্ষতকার নেয়া হয়েছে। তার ভাষ্য- পরিবারের অবস্থা ভালো না। করোনায় প্রবাসী বাবা দেশে ফিরে এসেছেন। এখন বেকার। এ অবস্থায় বাড়ি থেকে পড়ার খরচ দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দুটি টিউশনি করি। একটি থেকে ৩৫০০, এবং অন্যটি থেকে ২৫০০ টাকা আসে। চার হাজার টাকা কেবল বাসা ভাড়া। বাকি টাকা দিয়ে কিভাবে চলে?

সেদিন বাজারে গিয়ে ইলিশ মাছের দাম জিজ্ঞেস করছি। মাছ ওয়ালা মামা বললেন ‘মামা, তেলাপিয়া মাছ নেন। স্টুডেন্টরাতো তেলাপিয়া মাছ খায়। সে আমাকে ইলিশের দামও বললো না’। এমন আরো সাক্ষাতকার রয়েছে ওই প্রতিবেদনে। কথাগুলো শুনে ইমোশনাল না হয়ে পারলাম না। বর্তমান ইলিশের বাজার এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাস্তব চিত্র পেলাম মেয়েটির কথায়।

জনজীবনকে এভাবে অসহায় করে তুলছে বাজার সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে নিত্যপন্যের দাম বাড়ছে। ইলিশ হচ্ছে হাত ছাড়া। মজার ব্যাপার বলো এই বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারের তেমন কোনো কার্যক্রম নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অসহায়। মন্ত্রীদের বক্তব্য শুনলে হাসি পায়। জনগণের ভোট ডাকাতি করে জনগণের কল্যাণ করবে বলে শপথ নিয়েছিলেন সেইসব মন্ত্রীদের এই অসহায়ত্ব দেখলে মায়া লাগে। ইশ্ কত স্বপ্ন ছিলো এইসব চোরদের। কত আকঙ্খা ছিলো জোর করে জনগণের অবস্থার উন্নতি করার। অথচ এখন কত অসহায় এই সিন্ডিকেটের কাছে।

ইলিশের স্বাদ সাধারণ মানুষের জিভে আর লাগানোর সুযোগ নেই। এখন তিন বেলার যায়গায় দুই বেলা কোনো রকম খেয়ে কাটাতে হবে। ফলমুলসহ প্রাণিজ আমিষের ওপর থেকে নজর সরিয়ে নিতে হচ্ছে। এই অবস্থায় স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা দেশের সামনের দিনগুলোতে স্থুল মানুষের সংখ্যা বাড়বে। কেননা উদর পুর্তি করতে হলে মানুষের শর্করা নির্ভরশীলতা বাড়াতে হবে। ততে করে নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ বাড়বে। যা আমাদের পুরো স্বাস্থ্যখাতে বিপর্যয় ডেকে আনবে। এই যখন অবস্থা তখন আমরা আরেকটি জাতীয় নির্বাচনের দিকে ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছি। নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীনরা যেমন নির্বাচনী মাঠ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করবে তেমনি বিরোধী পক্ষ চাইবে মাঠ দখল করতে। এই পরিস্থিতিতে বাজার সিন্ডিকেট ধংস কিংবা বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যে কেউই বেশি কিছু করার সুযোগ পাবে না সেটি বোধগম্য। প্রশ্ন হলো- ক্ষমতার মসনদের একটা ফয়সালা হয়তো ঠিকই হয়ে যাবে কিন্তু এই বাজার সিন্ডিকেট নিয়ে কোনো ফয়সালা হবে না। তাই ঘুচবে না সাধারণ মানুষের দুরাবস্থাও।

লেখক: ঢাকা অফিস প্রধান, নবযুগ।

শেয়ার করুন: