ছবি: সংগৃহীত
অবৈধ অভিবাসীদের ওপর স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্প প্রশাসন একটি শক্তিশালী হাতিয়ারকে নতুন করে প্রয়োগ করছে। আর তা হলো নাগরিক জরিমানা, যার পরিমাণ সর্বোচ্চ ১৮ লাখ (১.৮ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
ইমিগ্রেশন বিচারক দেশে থাকার কোনো আইনি অধিকার নেই মর্মে রায় দেওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার অপরাধে, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট (ডিএইচএস) থেকে ইতিমধ্যে ১ লাখেরও বেশি মানুষ চিঠি পেয়েছেন। চিঠিতে তাদের প্রতিদিনের অবস্থানের জন্য ৯৯৮ ডলার করে বকেয়া পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১৯৯৬ সালের অভিবাসন আইন পাসের পর থেকেই ‘বহিষ্কার’ বা ‘দেশত্যাগের’ আদেশ অমান্য করার জন্য এ ধরনের জরিমানার বিধান ছিল। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানই এই ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রয়োগ করেননি। তার প্রথম মেয়াদে এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলেও প্রশাসনিক জটিলতায় তা থমকে গিয়েছিল।
কিন্তু গত বছর হোয়াইট হাউসে ফিরে এসে গণ-বিতাড়ন অভিযান শুরু করার পর, ট্রাম্প অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ব্যক্তিদের কাছ থেকে ‘সকল প্রকার জরিমানা ও শাস্তিমূলক অর্থ ধার্য এবং আদায় সুনিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ নেওয়ার নির্দেশ দেন।
ইমিগ্রেশন আইনজীবীদের মতে, প্রশাসন অবৈধ অভিবাসীদের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ানোর পদক্ষেপ নেওয়ায় এখন জরিমানা পাঠাবার গতি বহুলাংশে বেড়েছে।
যারা এ ধরনের নোটিশ পাচ্ছেন, তাদের জন্য এটি এক চরম উভয়সংকট: এতদিন ধরে গড়ে তোলা জীবন এক নিমেষে গুটিয়ে ফেলা, নতুবা সরকার ঋণ আদায়ের আইনি পদক্ষেপ নিলে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার ভয়। আইনে নির্ধারিত পাঁচ বছরের সর্বোচ্চ সীমার হিসাব ধরলেও, প্রতি ব্যক্তির ওপর জমাকৃত জরিমানার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৮ লাখ ডলারে।
মেক্সিকান অভিবাসী ভিভি ভাসকেজ ১৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছেন এবং মানবিক ভিসার জন্য তার একটি আবেদন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ওয়ার্ক পারমিট থাকায় তিনি একটি কনভেনিয়েন্স স্টোরে বৈধভাবে কাজ করছিলেন এবং বয়স্কদের সেবা দিতেন।
ভিসা আবেদনের হালনাগাদ তথ্যের আশায় ভাসকেজ এপ্রিল মাসে ডিএইচএস লোগোযুক্ত একটি খাম খোলেন। কিন্তু সংবাদের বদলে তিনি একটি ফরম-চিঠি পান, যেখানে সরকার একটি ঘরে টিকচিহ্ন দিয়ে জানিয়েছে যে তিনি ‘স্বেচ্ছায় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে’ যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগে ব্যর্থ হয়েছেন।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস কর্তৃক পর্যালোচিত ওই নথি অনুযায়ী, সরকারের কাছে তার বকেয়া পাওনা দাঁড়ায় ১৮,২০,৩৫২ ডলার। একই খামে কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন পরিচালিত অ্যাপের একটি প্রচারপত্র ছিল, যার শিরোনাম ছিল : ‘সিবিপি হোম-এর সাথে স্বেচ্ছায় দেশত্যাগ করুন এবং নিজের শর্তে বিদায় নিন।’ সেখানে উল্লেখ ছিল, যারা অ্যাপটি ব্যবহার করে স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়বেন, তাদের সব জরিমানা ‘মওকুফ’ করা হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করার অপরাধে সরকার অভিবাসীদের কাছে ১৮ লাখ ডলারের বেশি জরিমানার চিঠি ডাকযোগে পাঠাচ্ছে।
মানবাধিকার ও আইনি সহায়তাকারী সংস্থা এবং আইনজীবীরা সরকারের এই নীতিকে চ্যালেঞ্জ করে বেশ কয়েকটি ফেডারেল মামলা দায়ের করেছেন। তাদের দাবি, এই আর্থিক জরিমানা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার লঙ্ঘন করে এবং অষ্টম সংশোধনীতে উল্লেখ থাকা ‘অতিরিক্ত জরিমানা আরোপের নিষেধাজ্ঞা’-র পরিপন্থী।
আদালতে এই নীতি স্থগিতের আবেদনের বিরোধিতা করে সরকার যুক্তি দিয়েছে, কোনো ব্যক্তি আইনি আশ্রয়ের চেষ্টা করার উদ্দেশ্যে দেশে রয়ে গেলেও ‘আইন অনুযায়ী তা কোনো যুক্তি হতে পারে না এবং এতে বহিষ্কারের আদেশ স্বেচ্ছায় অমান্য করার মূল বিষয়টি বদলে যায় না।’
লস এঞ্জেলেস, শিকাগো এবং মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল এজেন্টদের ব্যাপক অভিযান ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের সবচেয়ে দৃশ্যমান দিক হলেও, এই জরিমানা মূলত অভিবাসীদের চাপে ফেলা এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বসবাস অসম্ভব করে তোলার এক সমান্তরাল কৌশল।
টাইমস কর্তৃক সাক্ষাৎকার নেওয়া এক ডজন আইনজীবীর মতে, ভাসকেজের মতো জয় পাওয়া মোটেও সহজ বা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। একের পর এক মামলায় আপিল খারিজ করে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি ৬৮ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের আপিলও খারিজ করা হয়েছে, যিনি ক্যানসার আক্রান্ত তার মার্কিন নাগরিক স্ত্রীর প্রধান পরিচর্যাকারী।
উক্ত ব্যক্তিকে ২০১২ সালে দেশত্যাগের আদেশ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু হোমল্যান্ড সিকিউরিটি তার বহিষ্কার স্থগিত রাখার পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। কয়েক মাস আগে তিনি একটি ফরম-চিঠি পান, যেখানে বলা হয় তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে দেশ ছাড়তে ব্যর্থ হয়েছেন এবং সরকারের কাছে তার বকেয়া পাওনা ৫,৭৯,৮৩৮ ডলার।
উক্ত ব্যক্তির ডেট্রয়েটভিত্তিক আইনজীবী রিম খরাইজাত বলেন, ‘আপনি লোকজনকে এখানে থাকার অনুমতি দেবেন, আবার হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে তার জন্যই জরিমানা করবেন, এটা হতে পারে না।’
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে যে, ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি থেকে এই বছরের জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত, বহিষ্কারের আদেশের পরও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা অ-নাগরিকদের কাছে ‘আইস’ ১০৩,০০০-এরও বেশি জরিমানার চিঠি পাঠিয়েছে, যার সম্মিলিত পরিমাণ ৮৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
সংস্থাটির মতে, ১৬ জুলাই পর্যন্ত তারা ১২ লাখ ডলারেরও বেশি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে।
জীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় রক্ষায় মরিয়া হয়ে কিছু অভিবাসী তাদের সম্পত্তির দলিল থেকে নিজেদের নাম সরিয়ে নিচ্ছেন বা ট্রাস্টের অধীনে সম্পত্তি হস্তান্তর করছেন বলে অভিবাসীদের এস্টেট প্ল্যানিংয়ে সাহায্যকারী দুই আইনজীবী জানিয়েছেন।
পাবলিক জাস্টিস নামের একটি অমুনাফামূলক আইনি সংস্থার জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চালর্স মুর (যিনি মাসাচুসেটসের একটি মামলায় অভিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব করছেন) বলেন, ‘প্রশাসন সাধারণ মানুষকে ভয় দেখিয়ে ও হয়রানি করে দেশত্যাগে বাধ্য করতেই যত বেশি সম্ভব জরিমানার নোটিশ জারি করে চলেছে।’
কতজন অভিবাসী জরিমানা এড়াতে স্বেচ্ছায় দেশ ছেড়েছেন এবং কতটি মামলা ঋণ আদায়কারী এজেন্সির কাছে পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট কোনো উত্তর দেয়নি। আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও সরকারের এই নীতির কঠোর প্রয়োগ থেমে নেই।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চিঠিগুলো সার্টিফাইড ডাকে পাঠানো হতো, যেখানে গ্রহীতাকে স্বাক্ষর করে গ্রহণ করতে হতো। ফলে অনেক চিঠিই ডিএইচএস-এর কাছে ‘পৌঁছানো সম্ভব হয়নি’ বলে ফেরত আসত।
প্রেসিডেন্ট জোসেফ আর. বাইডেন জুনিয়র ক্ষমতা গ্রহণের পর এই নীতি বাতিল করেছিলেন, কিন্তু ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই একটি নির্বাহী আদেশ এবং দ্রুত কার্যকর করা নীতিমালার মাধ্যমে আরো কঠোর জরিমানা ধার্য করে নীতিটি আবার চালু করেন।

















