শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সাপ্তাহিক নবযুগ :: Weekly Nobojug

‘সস্তা’ বাজারে ক্রেতাদের হিড়িক

যুুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির দামে রেকর্ড পতন

নবযুগ রিপোর্ট

প্রকাশিত: ১৪:৪৮, ৫ জুন ২০২৬

যুুক্তরাষ্ট্রে বাড়ির দামে রেকর্ড পতন

ছবি: সংগৃহীত

আমেরিকার চরম উত্তপ্ত আবাসন বাজার অবশেষে হয়তো মাটিতে নেমে আসছে। কয়েক বছর ধরে চলা দরাদরি, চড়া সুদের হার, আকাশচুম্বী দাম এবং উচ্চ মূল্যের কারণে ক্রেতাদের বাজার থেকে ছিটকে যাওয়ার পর, দেশজুড়ে বিক্রেতারা এখন তাদের প্রত্যাশা কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ, গত প্রায় এক দশকের মধ্যে বাড়ির দামে সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে। আর খুব কম মানুষই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, এমন একটি নাটকীয় মোড় নিয়ে ক্রেতারা আবারো বাজারে দেদারসে ফিরে আসছেন।

হতাশ গৃহসন্ধানীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই দামের সংশোধন এক নতুন সুযোগের জানালা খুলে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
রিয়েলটরের সর্বশেষ আবাসন প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে জাতীয় পর্যায়ে বাড়ি বিক্রির মধ্যম তালিকাভুক্ত মূল্য আগের বছরের তুলনায় ২.৪% কমে ৪,২৯,৫০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে সংস্থাটি এ-সংক্রান্ত তথ্য বা ডাটা ট্র্যাক করা শুরু করার পর থেকে এটিই সবচেয়ে বড় বার্ষিক পতন, যা টানা সাত মাস ধরে বাড়ির দাম কমার ধারাকে আরো দীর্ঘায়িত করল।
মর্টগেজ বা গৃহঋণের সুদের হার ৬.৫%-এর ওপরে আটকে থাকা, মুদ্রাস্ফীতি পারিবারিক বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতিবিদদের পূর্বাভাসের চেয়ে ক্রেতারা অনেক বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। চুক্তি চূড়ান্ত হওয়া বাড়ি বিক্রির হার এক বছর আগের তুলনায় ৪.৩% বেড়েছে, যা টানা ষষ্ঠ মাসের মতো এই খাতের প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে। অন্যদিকে মে মাসে নতুন বাড়ির মজুদ ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রিয়েলটরের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ জেক ক্রিমেল বলেন, ‘এই দুটি প্রবণতা কিন্তু একে অপরের বিরোধী নয়। বিক্রেতারা এখন বাজার যাচাই করার জন্য অবাস্তব দাম না হেঁকে, বরং বাড়িটি যেন দ্রুত বিক্রি হয়ে যায় সেই অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করছেন। অন্যদিকে ক্রেতারা, সুদের হার ধারণার চেয়ে বেশি থাকা সত্ত্বেও দাম বাজেটের মধ্যে এলেই বাজারে চলে আসছেন।’
করোনা মহামারির সময়কার মতো আকাশচুম্বী দাম হাঁকিয়ে একবারে বড় চক্কা মারার চেষ্টা না করে, বিক্রেতারা এখন ক্রমবর্ধমানভাবে এক নতুন বাস্তবতাকে মেনে নিচ্ছেন। মে মাসে দাম কমানো হয়েছে এমন বাড়ির তালিকা আসলে ১৭.৫%-এ নেমে এসেছে। এটি ইঙ্গিত করে, বাড়ির মালিকরা এখন অবাস্তব দাম নির্ধারণ করে পরে দাম কমানোর চেয়ে—বাড়ির সামনে ‘বিক্রি হবে’ সাইনবোর্ড ঝোলানোর আগেই নিজেরা বাজার নিয়ে ভালোমতো হোমওয়ার্ক বা যাচাই-বাছাই করে নিচ্ছেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ডগলাস এলিম্যানের রিয়েল এস্টেট এজেন্ট ভিক্টর কারি বলেন, ‘মহামারির সময়ে বিক্রেতারা ইচ্ছামতো চড়া দাম হাঁকাতে উৎসাহিত হলেও সেই দিনগুলো এখন অতীত। আমি নিজে সঠিক দাম নির্ধারণের পক্ষে বড় বিশ্বাসী। বাজারে যদি কোনো বাড়ির দাম যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা হয়, তবে তা বিক্রি হবেই। আর দাম যদি অতিরিক্ত চড়া হয়, তবে তা অবিক্রিত অবস্থায় পড়েই থাকবে।’
কিছু বাজার এই পরিবর্তনের প্রভাব অন্যগুলোর চেয়ে অনেক বেশি টের পাচ্ছে।
দেশজুড়ে দাম কমার ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে মেমফিস, যেখানে এক বছরের ব্যবধানে দাম কমেছে ১৩%। এরপরেই রয়েছে বাফেলো (১১.৬%), অস্টিন (৯.৫%) এবং লস অ্যাঞ্জেলেস (৭.৯%)।
অস্টিন, যা একসময় আমেরিকার আবাসন বাজারের নাটকীয় উল্লম্ফনের অন্যতম প্রধান প্রতীক বা পোস্টার চাইল্ড ছিল, সেখানে এখন অন্যতম তীব্র ধস দেখা যাচ্ছে। সর্বোপরি, মহামারির সময়ে এই বাজারে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বাড়ি তৈরি করা হয়েছিল। প্রতি বর্গফুট হিসেবে বাড়ির দাম সেখানে ৮.৩% কমে গেছে, আর সম্পত্তিগুলো এক বছর আগের তুলনায় এখন অনেক বেশি সময় ধরে বাজারে অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে থাকছে।
তবুও ক্রেতারা উধাও হয়ে যাননি। টেক্সাসের এই রাজধানীতে বিক্রির কার্যক্রম আশ্চর্যজনকভাবে স্থিতিস্থাপক রয়েছে। কারণ কমতে থাকা দাম ক্রেতাদের আবারো বাজারের দিকে প্রলুব্ধ করছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের গল্পটাও একই রকম।
কারি বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ, শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা, মুদ্রাস্ফীতি এবং উচ্চ সুদের হারের কারণে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা অনিশ্চয়তা বোধ করছেন এবং পিছিয়ে যাচ্ছেন, অথবা অন্ততপক্ষে আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছেন।’
তবুও তিনি বিশ্বাস করেন যে, এই অঞ্চলের বিলাসবহুল আবাসন বাজারটি বড় ধরনের পতন থেকে সুরক্ষিত রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এই চড়া মূল্যের বাজারের ক্রেতারা মূলত কোনো একটি বাড়ি কেনার সময়ে তাঁদের সাধ্যের দিকে বেশি নজর দেন। দাম কিছুটা ওঠানামা করতে পারে, তবে আমাদের এখানে অতিরিক্ত বাড়ি তৈরি করা হয়নি। তাই দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে হলে অর্থনীতির বড় ধরনের কোনো বিপর্যয় ঘটতে হবে।’
গ্রীষ্মকালজুড়ে এই ভারসাম্য বজায় থাকবে কি না, সেটিই এখন বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
ক্রিমেল বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ২০২৬ সালে, বাড়ি কেনার চুক্তি বাতিলের হার গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশ কম রয়েছে। এই ধারা যদি জুন মাস পর্যন্ত বজায় থাকে, তবে আমরা আরো আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারব, ইরান যুদ্ধের অনিশ্চয়তা গত বছরের শুল্কজনিত ধাক্কার চেয়ে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলছে : এর প্রভাব সুদের হার ও মানুষের মানসিকতায় টের পাওয়া গেলেও, কেনাবেচার আচরণে এখনো তা দেখা যায়নি।’
 

শেয়ার করুন: