ছবি - নবযুগ
‘একটি অসৎ গোষ্ঠী কর্তৃক অব্যাহত মিথ্যাচার এবং অপপ্রচারের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামবাসী এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রকৃত সত্য তুলে ধরার জন্য’ সংবাদ সম্মেলন করেছে সংগঠনটির বর্তমান নেতৃত্ব। ৮ জুন, সোমবার জ্যাকসন হাইটসের নবান্ন পার্টি হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের ইতিহাস, নির্বাচন,
চলমান মামলা, ভবন দখল, ভাড়া বকেয়া, দাফন কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো: আরিফুল ইসলাম। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সভাপতি মাহমুদ আবু তাহের, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য কামাল হোসেন মিঠু ও মো: আরিফুল ইসলাম। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মো; হানিফ, মনির আহমেদ, মোরেশদ রেজভী, সেলিম, এনাম চৌধুরী, শিহাব উদ্দিন চৌধুরী লিটন, মতিউর রহমান চৌধুরী, আবু তালের চৌধুরী চান্দু, শাজাহান, জামাল চৌধুরী, কালাম, মতি, টি আলম, শফিক, নুরুল আমিন, খলিবুল্লা তামীম মহসিন প্রমুখ। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সংগঠনের নেতারা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, গণমাধ্যম সমাজের সত্য তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই চট্টগ্রাম সমিতিকে ঘিরে চলমান বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের জবাবে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতেই এ আয়োজন।
এ সময় তারা সমিতির প্রয়াত নেতাদের স্মরণ করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন দীন এম রানা, সৈয়দ এম রেজা, আব্দুল হাই জিয়া, হেলাল উদ্দিন তসলিম, কামাল উদ্দিন, অ্যাডভোকেট নিজাম উদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন, আসাদুল্লাহ হিল গালিব, অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ, ডা. আনোয়ার মিয়া, বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিউল আজম শফি প্রমুখ। বক্তারা বলেন, প্রায় ৩৭ বছরের পুরোনো চিটাগাং এসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা ইনক নানা চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে আজকের অবস্থানে এসেছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় তৎকালীন সভাপতি আব্দুল হাই জিয়ার মৃত্যু সংগঠনটিকে বড় সংকটে ফেলে। পরবর্তীতে সব পক্ষের সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি গঠন করা হয় এবং দীর্ঘ ১৭ মাস পর নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে নির্বাচনের পথ সুগম হয়।
তাঁদের দাবি, প্রথমদিকে একটি পক্ষ একতরফাভাবে নির্বাচন কমিশন গঠনের চেষ্টা করলেও পরে সবার সম্মতিতে পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। নির্বাচন পরিচালনার জন্য স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ‘ইউনাইটেড ইলেকশন সার্ভিস’-কে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ব্রুকলিন, কুইন্স, নিউ জার্সি ও কানেক্টিকাটের চারটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান কমিটির নেতারা বলেন, নির্বাচনে দুটি প্যানেলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় এবং সাধারণ সম্পাদক পদে একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী অংশ নেন। ভোটগ্রহণ শেষে কয়েকটি পদের ভোটের ব্যবধান চ্যালেঞ্জড ভোটের সংখ্যার কাছাকাছি হওয়ায় নির্বাচন কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ ফলাফল ঘোষণা থেকে বিরত থাকে। পরে ছয়টি চ্যালেঞ্জড ভোট যাচাই-বাছাই শেষে ইউনাইটেড ইলেকশন সার্ভিসের সরবরাহ করা ফলাফলের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন সর্বসম্মতিক্রমে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করে।
তাঁদের অভিযোগ, ফলাফল ঘোষণার পর নির্বাচনে পরাজিত সভাপতি পদপ্রার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় কিছু গণমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেন এবং নির্বাচন কমিশনসহ চট্টগ্রামবাসী সম্পর্কে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। পরে জনরোষের মুখে তিনি সেসব পোস্ট সরিয়ে নেন বলেও দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সংগঠনের সংবিধানের ১৫.২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ফলাফল ঘোষণার ১৫ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণের বিধান রয়েছে। সে অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৩ নভেম্বর শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাহের-আরিফ পরিষদের সদস্যরা শপথ নিলেও অপর প্যানেলের নির্বাচিতরা শপথ গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। পরবর্তীতে সাংগঠনিক প্রয়োজন বিবেচনায় দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিজয়ী ঘোষণা করে শূন্য পদ পূরণ করা হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ১৯ সদস্যবিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বলে তারা দাবি করেন।
বর্তমান নেতৃত্বের অভিযোগ, শপথের পর পরাজিত পক্ষ জোরপূর্বক চট্টগ্রাম ভবনের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা করে। তবে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাহের-আরিফের নেতৃত্বাধীন নতুন কমিটি অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ভবনের ডিড, ব্যাংক হিসাব, কবরের বরাদ্দসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অন্যান্য নথি বুঝে নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির আটজন বৈধ সদস্যের মধ্যে একজন বাংলাদেশে অবস্থান করায় বাকি সাতজনের মধ্যে পাঁচজনের সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়।তারা আরও দাবি করেন, ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে কিছু ব্যক্তি ভবনের তালা ভেঙে প্রবেশ করলে স্থানীয় থানায় অভিযোগ করা হয়। পরে গোয়েন্দা তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা করেন। মামলায় বার্গলারি, অ্যাটেম্পটেড বার্গলারি, ক্রিমিনাল মিসচিফ ও ক্রিমিনাল ট্রেসপাসের অভিযোগ আনা হয়। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অর্ডার অব প্রোটেকশন জারি করা হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
চট্টগ্রাম ভবনের ভাড়া বকেয়া নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। বর্তমান কমিটির দাবি, মাকসুদ-মাসুদ প্যানেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা দুই প্রার্থী চট্টগ্রাম ভবনের ভাড়াটিয়া। নির্বাচনের পর থেকে তারা এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও একজন ভাড়াটিয়া কোনো ভাড়া পরিশোধ করেননি। ভাড়া আদায়ের উদ্যোগ নিলে তারা দাবি করেন, ভাড়া অন্য পক্ষকে পরিশোধ করা হয়েছে। নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ভাড়া পরিশোধ না করায় ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির পরামর্শে ল্যান্ডলর্ড-টেন্যান্ট কোর্টে মামলা করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে ওই তিন ভাড়াটিয়ার কাছে সমিতির পাওনা ভাড়ার পরিমাণ ৯৭ হাজার ৭১১ ডলার ২০ সেন্ট। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে। এ সময় আরও জানানো হয়, পরাজিত মাকসুদ-মাসুদ প্যানেলের সদস্য এবং তাঁদের কিছু সহযোগী নির্বাচন কমিশন, অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি, বর্তমান কার্যকরী কমিটি এবং ইউনাইটেড ইলেকশন সার্ভিসের বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলাও দায়ের করেছেন। মামলায় তাঁরা নিজেদের চট্টগ্রাম সমিতির বৈধ কর্তৃপক্ষ দাবি করে আদালতের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। বর্তমানে মামলার শুনানির তারিখ ২০২৭ সালের গ্রীষ্মকালীন সময়ে নির্ধারিত হয়েছে বলে জানানো হয়।
বর্তমান কমিটির দাবি, পরাজিত প্যানেলের সদস্যরা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এই মামলা করেছেন এবং মামলাটিকে সামনে রেখে চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান কমিটি তাদের বিভিন্ন কর্মকা-ও তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে ট্রাস্টি বোর্ড ও উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন, বৃহৎ পরিসরে ইফতার মাহফিল, কুইন্সে প্রথমবারের মতো বড় আকারে ইফতার অনুষ্ঠান, বেলমন্ট লেক স্টেট পার্কে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের অংশগ্রহণে পিকনিক, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে মিলাদ মাহফিল ও চাটগাঁইয়া মেজবান, দুই দফা পহেলা বৈশাখ উদযাপন, নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলওম্যান শাহানা হানিফকে সংবর্ধনা এবং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন। সংগঠনের অন্যতম জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম হিসেবে দাফন-সৎকার কার্যক্রমের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমান কমিটি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সাতজনকে নিউজার্সির মার্লবোরো মুসলিম কবরস্থানে বিনামূল্যে দাফনের ব্যবস্থা করেছে এবং আরও দুজনকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য অতিরিক্ত কবরের জায়গা কেনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান নেতৃত্ব দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির ঘোষণা দিয়ে দাবি করে, অতীতে সংগঠনের অর্থ আত্মসাৎ ও অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। তাদের অভিযোগ, ২০২১ সালে অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি গঠনের আগে অনুষ্ঠিত একটি নির্বাচনে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ হাজার ডলার আত্মসাৎ করা হয় এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছ হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি।শেষে বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম সমিতিকে বিভক্তি, অপপ্রচার ও ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি থেকে মুক্ত রেখে একটি ঐক্যবদ্ধ, স্বচ্ছ ও জনকল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। চট্টগ্রামবাসীর সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে সংগঠনটি আরও শক্তিশালী হবে বলেও তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।

















