ছবি সংগৃহীত
মার্ক জাকারবার্গের প্রতিষ্ঠান মেটা ৪৮টি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলদের সাথে এক ঐতিহাসিক সমঝোতার অংশ হিসেবে ১৮ বিলিয়ন (১,৮০০ কোটি) ডলার দিতে সম্মত হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেলদের অভিযোগ ছিল, শিশুদের অ্যাপে আসক্ত করার উদ্দেশ্যেই মেটা ইচ্ছা করে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক তৈরি করেছিল।
বুধবার আদালতে জমা দেওয়া একটি নথি অনুযায়ী, এই চুক্তির অধীনে মেটা বেশ কিছু পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিদিন অ্যাপ ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ, রাতে ঘুমানোর আগে ব্যবহার বন্ধ রাখতে ‘নাইট ব্লকিং’ সুবিধা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুরা যাতে ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে ‘উন্নত বয়স যাচাইকরণ ব্যবস্থা।’
একই সাথে একটি ‘সম্মতিসূচক রায়ের’ অংশ হিসেবে মেটা অভিভাবকদের সন্তানদের অনলাইনে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করার জন্য ‘অতিরিক্ত কিছু টুল বা সুবিধাও’ তৈরি করতে সম্মত হয়েছে।
তবে সমালোচকরা উল্লেখ করেছেন, এই চুক্তি সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তির পেছনে দায়ী অ্যালগরিদমগুলোকে স্পর্শই করেনি।
নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির বিজনেসের অধ্যাপক এবং ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘দ্য অ্যাংশাস জেনারেশন’ বইয়ের লেখক জোনাথন হাইড বুধবার এক্স-এ (টুইটার) একটি পোস্টে লিখেছেন, ‘মেটার এআই-চালিত রেকমেন্ডেশন ইঞ্জিন এখনো চলছে, যা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন ক্ষতিকর কনটেন্ট সত্ত্বেও তরুণদের প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখা যায়।’
হাইড আরো যোগ করেন, ‘সামনের কাজটি হলো তাদেরকে সেই ডিজাইনে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করা, শিশুরা কতটা সময় ইনস্টাগ্রামের এই ক্ষতিকর ডিজাইন ব্যবহার করতে পারছে কেবল তা সীমিত করা নয়, কিংবা অপ্ট-ইন (ঐচ্ছিক গ্রহণ) ভিত্তিতেও নয়। এটি একটি বড় পদক্ষেপ। আসুন আমরা সবাই মিলে কাজ করি যেন এটিই শেষ পদক্ষেপ না হয়।’
এই সমঝোতার অংশ হিসেবে মেটা নিজেদের কোনো অপরাধ স্বীকার করেনি এবং আদালতের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা এই সিদ্ধান্ত বা প্রোডাক্টের পরিবর্তনগুলো তাদের অন্য অ্যাপ (যেমন : হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার বা তাদের এআই চ্যাটবট)-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
১০ বছর মেয়াদি এই ১৮ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিটি কোনো বিগ টেক প্রতিষ্ঠানের দ্বারা প্রদান করা সর্বকালের সবচেয়ে বড় নিয়ামক জরিমানা। এটি ২০১৯ সালে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারির নিষ্পত্তি করতে মেটার দেওয়া ৫ বিলিয়ন ডলারের জরিমানা কিংবা ২০১৮ সালে গুগলের অ্যান্ড্রয়েড সফটওয়্যারকে লক্ষ্য করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৫ বিলিয়ন ডলারের জরিমানাকেও অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে।
তা সত্ত্বেও এটি মেটার জন্য সামান্যই এক অঙ্ক, কারণ প্রতিষ্ঠানটি কেবল গত বছরেই ২০০.১ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় করেছে। সেই পরিসংখ্যান হিসাব করলে, মেটা প্রতি ৩৩ দিনে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার আয় করে।
আরেকটি বড় বিষয় হলো, মেটা এই চুক্তির ১২.৭ বিলিয়ন ডলার, বা সমঝোতার মোট অর্থের ৭০%, বার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবে, যদি না তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী টিকটক এবং ইউটিউবও সম্মিলিতভাবে অঙ্গরাজ্যগুলোকে ৫.৩ বিলিয়ন ডলার দিতে এবং কিশোরদের জন্য দৈনিক ১ ঘণ্টার ব্যবহারসীমাসহ একই ধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়ন করতে সম্মত হয়। তারা রাজি হলে মেটা বাকি ৩০% বা অতিরিক্ত ৫.৩ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করবে।
সংখ্যার বিচারে মেটার ঐতিহাসিক ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতার বিস্তারিত তথ্য :
১৮ বিলিয়ন ডলার : মেটার ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্থ পরিশোধের সিদ্ধান্ত, যা ২০১৯ সালে এফটিসি-কে দেওয়া ৫ বিলিয়ন ডলারের জরিমানাকেও অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে।
৩৩ দিন : ২০২৫ অর্থবছরে মেটার ২০০.১ বিলিয়ন ডলার রাজস্বের ওপর ভিত্তি করে, এই ১৮ বিলিয়ন ডলার আয় করতে মেটার সময় লাগে মাত্র ৩৩ দিন।
৩০% : মেটা ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতা অর্থের ৭০% দিতে সম্মত হয়েছে, তবে বাকি অংশ শুধুমাত্র তখনই দেবে যদি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী টিকটক এবং ইউটিউব নিজেদের পক্ষ থেকে সম্মিলিতভাবে ৫.৩ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করতে এবং অ্যাপের ডিজাইনে একই পরিবর্তন আনতে রাজি হয়।
২ ঘণ্টা : কিশোর-কিশোরীদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের ওপর মেটা দৈনিক যে সময়সীমা আরোপ করতে রাজি হয়েছে। টিকটক ও ইউটিউবও একই পদক্ষেপ নিলে এই সীমা কমে ১ ঘণ্টা হবে।
৬ ঘণ্টা : ‘নাইট মোড’ ডিফল্ট সেটিংস, যা মধ্যরাত থেকে সকাল ৬টার মধ্যে কিশোর-কিশোরীদের অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ ব্লক বা বন্ধ রাখবে।
১০ বছর : চুক্তির অধিকাংশ ধারা ও শর্তাবলী যত বছর বলবৎ বা কার্যকর থাকবে।
তিনটি : কিশোর-কিশোরীদের অভিজ্ঞতায় তিনটি বড় পরিবর্তন—যার মধ্যে রয়েছে তথাকথিত ‘প্লাস্টিক সার্জারি ও চরম মেকআপ ফিল্টার’ নিষিদ্ধকরণ; কিশোরদের পোস্ট থেকে ডিফল্টভাবে ‘লাইক’ ও অন্যান্য প্রতিক্রিয়া সরিয়ে নেওয়া; এবং তারা কীভাবে অ্যাপ ব্যবহার করছে তার ওপর অভিভাবকদের শক্ত পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
শূন্য (০) : মেটার রেকমেন্ডেশন অ্যালগরিদমে পরিবর্তন বা বিধিনিষেধের সংখ্যা। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী জোনাথন হাইডের মতে, এটি এমনভাবে তৈরি যে ‘এমনকি ক্ষতিকর কনটেন্টের ক্ষেত্রেও তরুণদের ধরে রাখা ও আসক্ত করার ক্ষমতা এর সর্বোচ্চ।’

















