ছবি: সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রে মে মাসে মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ৪% ছাড়িয়ে গেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান খরচ পণ্যের দামের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়তে থাকায় মার্কিন নাগরিকেরা খাদ্যদ্রব্য থেকে শুরু করে বিমানের ভাড়াÑসবকিছুতেই এর প্রভাব টের পাচ্ছেন।
গত বুধবার ‘ব্যুরো অব লেবার স্ট্যাটিস্টিকস’ জানিয়েছে, গত ১২ মাসে ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) মে মাসে ৪.২%-এ উন্নীত হয়েছে, যা এপ্রিল মাসে ছিল ৩.৮%। আর এই মূল্যস্ফীতির চাপ এখনই কমার কোনো লক্ষণ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ৫ জুন শেষ হওয়া সপ্তাহে এক পাউন্ড ‘কসমিক ক্রিস্প’ আপেলের গড় দাম ছিল ২.৩৭ ডলার, যা গত বছরের ১.৫৩ ডলারের তুলনায় ৫৪.৯% বেশি।
একই তথ্যমতে, এক পাউন্ড টমেটোর গড় দাম ছিল ১.৯৭ ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ২১.৬% বেশি; অন্যদিকে সবুজ ক্যাপসিকামের (গ্রিন বেল পেপার) দাম পাউন্ড প্রতি ১৯.৫% বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.৭৮ ডলারে।
রেগান ক্যাপিটালের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা স্কাইলার ওয়াইনান্দ গত বুধবার এক নোটে বলেন, ‘ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম একবার বেড়ে গেলে, সেই প্রবণতা উল্টা দিকে ঘুরতে (কমতে) সময় লাগে। ফেডারেল রিজার্ভের নির্ধারিত ২% লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি মূল্যস্ফীতিকে ফিরিয়ে আনার পথটি সহজ হবে না এবং এটি দিন দিন আরো বেশি কল্পনাপ্রবণ হয়ে উঠছে।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বুধবার এই পরিসংখ্যানের পক্ষে সাফাই গেয়ে যুক্তি দিয়েছেন, ইরানের সাথে যুদ্ধ শেষ হওয়ামাত্রই জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং পণ্যের দাম দ্রুত কমে যাবে।
ট্রাম্প আরো বলেন, ‘জানেন আমি আসলে কী পছন্দ করছি? আমি এই মূল্যস্ফীতি পছন্দ করছি। জানেন কেন? কারণ এই যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্রই, জানেন আমি এখন এটা বলতে পারি... জানেন যে আমরা লাখ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করছি।’
হোয়াইট হাউস গত মাসে কিছু পণ্যের দাম কমে যাওয়ার বিষয়টিকেও ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরেছে, যার মধ্যে দুগ্ধজাত পণ্য এবং গাড়ি বিমার (অটো ইন্স্যুরেন্স) খরচ যথাক্রমে ০.৬% এবং ১.৭% কমেছে। সামগ্রিকভাবে দুগ্ধজাত পণ্যের দাম কমলেও মে মাসে কেবল দুধের দামই বেড়েছে ২.২%।
ইউএসডিএ-এর তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে কিছু পণ্যের দামে স্বস্তি দেখা গেছে। যেমন আইসবার্গ লেটুসের দাম গত বছরের চেয়ে ১২.১% কমে ১.৩১ ডলার হয়েছে। তবে রাস্পবেরির দাম ৯.২% বেড়ে প্রতি প্যাকেট ৩.১০ ডলার এবং এক পাউন্ড কমলার দাম ১০.২% বেড়ে ১.৫১ ডলার হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান খরচের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে মার্কিন নাগরিকেরা আরো বেশি ঋণের জালে জড়াচ্ছেন। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (কোয়ার্টার) মোট ক্রেডিট কার্ডের ঋণের পরিমাণ ১.২৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। আর ৪.২% মূল্যস্ফীতির অর্থ হলো—পণ্যের দাম প্রকৃত মজুরি বাড়ার হারকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এটি এই ঋণ সংকটকে আরো ঘনীভূত করতে পারে।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অনুযায়ী, গত বুধবার জাতীয় পর্যায়ে পেট্রোলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৪.১৫ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালি মূলত অবরুদ্ধ (ব্লকেড) থাকায় গত জুনের প্রতি গ্যালন ৩.১২ ডলারের তুলনায় এটি ৩৩% বেশি।
জেট ফুয়েলের (বিমানের জ্বালানি) আকাশচুম্বী দামের কারণে মে মাসে বিমানের ভাড়া ২.৭% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত ১২ মাসে সামগ্রিকভাবে ২৬.৭% বেড়েছে। জ্বালানি সাধারণত বিমান সংস্থাগুলোর সবচেয়ে বড় পরিচালন ব্যয়ের অন্যতম। এটি বিশেষ করে ইউরোপীয় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে। কারণ তারা মূলত আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিস্থিতিও খুব একটা ভালো নয়। মে মাসে এই খাতে খরচ ০.৩% বেড়েছে এবং তা গত বছরের এই সময়ের চেয়ে ১৬.৭% বেশি।

















