বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪

সাপ্তাহিক নবযুগ :: Weekly Nobojug

আজব হলেও গুজব নয়-৯

শুধু দু’ জনের রেস্টুরেন্ট

হাবিব রহমান

প্রকাশিত: ১৭:১৬, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৩

শুধু দু’ জনের রেস্টুরেন্ট

শুধু দু’ জনের রেস্টুরেন্ট

ইতালির এই রেস্তোরাঁটির নাম সলো পের দ্যুয়ে। যার অর্থই হলোকেবল দুজনের জন্য মালিকদের দাবি, শুধু ইতালি নয়, গোটা পৃথিবীর বিলাসবহুল রেস্তোরাঁগুলোর মধ্যে এটি আকারে সবচেয়ে ছোট। রেস্তোরাঁর বাইরের   ভেতরে জ্বলতে থাকা মোমবাতি মানুষকে আকৃষ্ট করে। রুপার একটি ঘণ্টা আছে ওয়েটারকে ডাকার জন্য। এখানকার সুস্বাদু ইতালিয়ান খাবার তৃপ্তি মেটাবে আপনার।

তবে সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, এতে কেবল একটি  টেবিল রুচিসম্মতভাবে সাজানো থাকে, আর সেখানে কেবল দুজন খাবার খেতে পারেন। তবে এখানে খাওয়াটা বেশ খরুচে। এখানে দুজনের এক বেলা খাবারের জন্য খরচ হবে ৫০০ ডলার

জায়গাটির অবস্থান কিন্তু চমৎকার। সলো পের দ্যুয়েতে ঘিরে আছে বিরল প্রজাতির বিভিন্ন গাছের এক বাগান। বিশেষ করে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে পামগাছের বিভিন্ন জাত শোভা বাড়াচ্ছে এর। পাশেই আছে একটি প্রতœতাত্ত্বিক এলাকা। ম্যানসনটা যে এস্টেটের মধ্যে সেখানে আগে ছিল একটি রোমান ভিলা। পরিত্যক্ত ভিলাটা ঘুরে দেখতে পারেন অতিথিরা। অতিথিদের স্বাগত জানাতে বাগান রেস্তোরাঁর প্রবেশপথে জ্বলতে থাকা মোমবাতি।

যেহেতু একসাথে মাত্র দুজন অতিথি একসাথে খেতে পারেন এজন্য কয়েক মাস আগে থেকে বুকিং না দিলে এখানে একটি ডিনার বা লাঞ্চ করার কোনো আশা নেই আপনার।

এই রেস্টুরেন্টে কিছু নিয়ম কঠোরভাবে মানা হয়। যেমন রিজার্ভেশনের আগে রেস্তোরাঁটির ভেতরে দেখার নিয়ম নেই। শেষ মুহূর্তে কোনো খাবার পরিবর্তন করা যাবে না। মালিকদের সঙ্গে কথা বলে যে সময় নির্ধারণ করা হয়েছে তখনই আসতে হবে অতিথিদের।

রেস্তোরাঁয় আসার সময়টা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে পৌঁছার ৩০ মিনিট আগে ফোনে জানাতে হবে অতিথিকে। বেশি আগেও আসা যাবে না। তাহলে রেস্তোরাঁর দুয়ার বন্ধ পাবেন, কেউ অভিবাদন জানাতেও থাকবেন না।

রোমের উত্তরে ভাকোনি গ্রামের ধারে বিশ শতকের একটি পাথরের ম্যানসানের অংশ ৫০০ বর্গফুটের কম জায়গার ছোট্ট ডাইনিং রুমটি। এখানে বুকিং করতে হয় ফোনে, আর খেতে আসার অন্তত দশ দিন আগে নিশ্চিত করতে হবে এটা। কী খাবেন সেটাও তখন জানিয়ে দিতে হবে।

৩৩ বছর ধরে সলো পের দ্যুয়ে নামক এই রেস্টুরেন্টে পরিচালনা করে আসছেন স্থানীয় তিন উদ্যোক্তা। এখানে খাবারের জন্য বুকিং দেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের নাম জানতে পারবেন না।

মজার ঘটনা হলো, কাছে-ধারেই একজন ওয়েটার থাকেন। তবে এমনিতে দেখা  দেবেন না। ছোট্ট রুপার ঘণ্টাটা বাজালেই তিনি হাজির হয়ে যাবেন।

বুকিং কনফার্মের পর অতিথিরা নানা পদের মেনু নির্বাচন করেন। এর মধ্যে থাকে মাছ কিংবা মাংস, ডেজার্ট, পানীয়। নানা ধরনের ইতালিয় খাবার বেছে নিতে পারেন অতিথিরা। হার্ট আকৃতির যে কেকটি পরিবেশন করা হয়, সেটায়  লেখা থাকে আগত দুই অতিথির নাম।

চমৎকার, রোমান্টিক পরিবেশে খাবার খাওয়ার জন্য রেস্তোরাঁটির জুড়ি মেলা ভার। বছরজুড়েই এখানে লাঞ্চ ডিনারের ব্যবস্থা থাকে। তবে আশ্চর্যজনক হলেও এই রেস্তোরাঁর কোনো নির্দিষ্ট মেনু থাকে না।

এখানে যারা খাবার খাওয়ার জন্য বুকিং দেন, তাদের পছন্দ রুচি অনুযায়ী খাবার বানান শেফ। শুধু তা- নয়, খাওয়ার সময় কী ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক বাজবে এবং কী ধরনের ফুল দিয়ে কীভাবে সাজানো হবে তাও আপনি বাছাই করে দিতে পারবেন।

হৃৎপিন্ড আকৃতির রাভিয়োলি, ঝিনুক, মাংসের কারপাচ্চিয়ো, হার্ট আকৃতির সাদা চকলেটসহ কারপাচিও সাধারণত বেশি অর্ডার দেন এখানকার অতিথিরা। ডাইনিংয়ের রেস্তোরাঁর বাগানের পরিবেশও মুগ্ধ করবে আপনাকে। লাল কিংবা সোনালি টবিলক্লথ, রুপার ছুরি-চামচ, পুরোনো পেইন্টিং, ঐতিহাসিক সব চরিত্রের আবক্ষ মূর্তি, সোনালি ফ্রেমের আয়না আর সব জায়গায় ফুলের ছড়াছড়ি- সব মিলিয়ে রীতিমতো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়বেন। মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত ফায়ারপ্লেস আর একটি পিয়ানোও মনোযোগ আকর্ষণ করবে।

এটা কেবলই একটি রেস্তোরাঁ নয়, অনন্য অন্তরঙ্গ একটি অভিজ্ঞতা উপহার দিই আমরা, এটাই আমাদের যুগ যুগ ধরে চলে আসা খ্যাতির মূলে আছে। কাজেই আমরা কে এটা বড় ব্যাপার নয়, আমরা ছায়ার মতো থাকি।নিজেকে মি. রেমো নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া মালিকদের একজন বলেন।

যেসব মানুষ এখানে আসেন তাঁরা অতিথি, যাঁদের আমরা সর্বোচ্চ যতœ নিই। বিশেষ এই সময়টা তাঁরা যেমন চেয়েছিলেন, সেভাবেই যেন কাটে তা নিশ্চিত করি আমরা। তাঁদের চাহিদা অনুসারেই সবকিছু তৈরি করা হয় এখানে।বলেন তিনি।

এমন একটি রেস্তোরাঁ স্থাপনের পেছনের আছে আশ্চর্য এক কারণ। রেমো জানান, লোকজনে ভরপুর রেস্তোরাঁ দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। পাশাপাশি অতিথিদের সঙ্গে যেমন আচরণ করা হয় এবং যেভাবে বসানো হয় সেটাও তাকে হতাশ করে।

এটা মেনে নেওয়া যাচ্ছিল না। প্রতিবারই আমি এবং আমার ছেলে ডিনারে গেলে আমাদের ভাগ্যে জুটত রান্নাঘর কিংবা বাথরুমের কাছের ছোট্ট একটি টেবিল। বদ গন্ধ নাকে এসে লাগত সব সময়। এর কারণ আমরা কেবল দুজন ছিলামবলেন রেমো।

আর তাই ভাবতে থাকেন এমন একটা কিছু করার যেখানে কোনো এক যুগল অসাধারণ এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারবেন। আর এর বাস্তব রূপ এই রেস্তোরাঁ।

এটা কোনো ব্যবসায়িক আলাপের জায়গা নয়। প্রেমিক- প্রেমিকা দম্পতিরা এখানে বিবাহবার্ষিকী, জন্মদিনসহ নানা বিষয় উদ্যাপনে উপস্থিত হন। নিজেদের মতো রাজকীয়, আনন্দময় এক সময় কাটান। এখানকার পরিবেশও  যেন রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা কিছু। রাতে ভেতরের বাতি থাকে  নেভানো, জ্বলে মোমবাতি।

খাওয়া শেষে যুগলেরাবুক অব থটসনামে একটি বইয়ে নিজেদের নানা স্মৃতি এখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে দুই-চার প্যারা লিখতে পারেন। অতিথিরা চাইলে তাদের আনার জন্য গাড়ির ব্যবস্থাও করা হয়। বাগানে আলাদা আলোকসজ্জারও ব্যবস্থা হয়। এমনকি এখানকার পরিবেশ দেখে যদি মুগ্ধ হন তবে আশপাশে কোথায় চমৎকার পরিবেশে থাকতে পারবেন সে ব্যাপারেও সুপরামর্শ দেবে রেস্তোরাঁ কর্তৃপক্ষ। কাজেই পাঠক ইতালি বেড়াতে গেলে আগে  থেকে এই রেস্তোরাঁয় একটি বেলা খাওয়ার জন্য বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন। অবশ্য সে ক্ষেত্রে ভ্রমণের বাজেটটা যে আপনার বাড়াতে হবে তাতে সন্দেহ নেই।

শেয়ার করুন: