ছবি: সংগৃহীত
এখনই কি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সময়? একটি বিশেষ উদ্ভিদ, যা একসময় ওপিওড (মাদক) আসক্তি নিরাময়ের সম্ভাব্য চিকিৎসা হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিল, গত দেড় দশকে দেশব্যাপী বিষক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলোতে ফোন আসার হার অবিশ্বাস্যভাবে ৬৫০০% বাড়িয়ে দিয়েছে।
ক্রাটম গাছ মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশের আদি উদ্ভিদ। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন ড্রাগ অ্যাবিউজ-এর মতে, এর পাতা থেকে তৈরি পিল, পাউডার এবং ঘন তরল বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মাদক ব্যবসায়ীদের নজর কেড়েছে, কারণ এগুলো ওপিওড এবং উদ্দীপক ওষুধের মতো প্রভাব তৈরি করতে পারে।
এর সমগোত্রীয় মাদক ‘কাভা’-এর মতো ক্রাটমও শতাব্দীকাল ধরে ঐতিহ্যবাহী ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে এর অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার ব্যাপক অপব্যবহার এবং মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে, যা ‘সোসাইটি ফর দ্য স্টাডি অফ অ্যাডিকশন’ এবং ‘মেডিক্যাল কলেজ অফ উইসকনসিন’-এর একটি নতুন প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়েছে।
আমেরিকার বিষক্রিয়া কেন্দ্রগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন যে, ২০১০ সালে ক্রাটম সংক্রান্ত বিষক্রিয়ার ঘটনা ছিল মাত্র ১৯টি, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,২৪২টিতে।
২০১০ সালে এই ঘটনাগুলোর কোনোটিই ‘মারাত্মক ফলাফল’ (যেমন জীবনহানি, স্থায়ী পঙ্গুত্ব বা মৃত্যু) হিসেবে চিহ্নিত হয়নি। এমনকি ২০১২ সালের আগে কোনো মারাত্মক ঘটনার রিপোর্টও পাওয়া যায়নি। কিন্তু ২০২৩ সালের মধ্যে এই মারাত্মক ফলাফলের সংখ্যা বেড়ে ১৫৮টিতে দাঁড়িয়েছে।
ক্রাটম এবং এফডিএ-এর সম্পর্ক মোটেই সুখকর নয়। সংস্থাটি এটিকে চিকিৎসার জন্য অনুমোদন দেয়নি এবং বর্তমানে এটি মার্কিন ‘কন্ট্রোলড সাবস্ট্যান্সেস অ্যাক্ট’-এর আওতায় নেই। এর অর্থ হলো, প্রতিটি অঙ্গরাজ্য তাদের নিজস্ব নিয়ম তৈরির সুযোগ পায়, এবং অনেক রাজ্যই কোনো নিয়ম না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক এবং মেডিক্যাল কলেজ অফ উইসকনসিনের ডক্টর রায়ান ফেল্ডম্যানের মতে, যেসব রাজ্যে কোনো নিয়ম নেই, সেখানে ক্রাটম ব্যবহারের ফলাফল সেইসব রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ ছিল যেখানে এটি নিষিদ্ধ।
তিনি বলেন, ‘ক্রাটমের ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে এর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। সারা দেশের আইনপ্রণেতারা এখন এর ব্যবহারের নিয়মাবলী নিয়ে বিতর্ক করছেন।’
ক্রাটম ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে যথেষ্ট গবেষণার অভাবে নীতি-নির্ধারকরা সবসময় সঠিক পথ বেছে নিতে পারছেন না। তবে বিজ্ঞানীরা এখন একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরছেন। ফেল্ডম্যান জানান, উদীয়মান গবেষণাগুলো দেখাচ্ছে যে ক্রাটমের কারণে খিঁচুনি, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, লিভারের ক্ষতি এবং শ্বাসকষ্টের মতো মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে।
তার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বিষক্রিয়া কেন্দ্রে আসা প্রতি ৭টি ঘটনার মধ্যে প্রায় ১ জন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে এবং ১৬ জনের মধ্যে ১ জনকে আইসিইউ -তে নিতে হয়েছে।
গবেষণা আরো দেখায় যে, ক্রাটম যদি অন্য কোনো ওষুধের সাথে মিশিয়ে নেওয়া হয় (যা প্রায়ই ঘটে), তবে এটি শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করে অন্য ওষুধটিকে আরো বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
অবশ্য এনআইডিএ-এর মতে, যারা ক্রাটমের ওষুধি গুণের ওপর গবেষণা চালায়, তাদের তথ্যমতে ক্রাটম ব্যবহারের কারণে মৃত্যু এখনো অত্যন্ত বিরল। বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনায় দেখা গেছে অন্য মাদক বা দূষিত পদার্থের উপস্থিতি ছিল।
এফডিএ-র ওয়েবসাইট অনুযায়ী, নিয়মিত ব্যবহারকারীরা সাধারণত একবারে ৬ গ্রামের কম ক্রাটম গ্রহণ করেন। মূলত ব্যথা, কাশি, ডায়রিয়া, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং ওপিওড আসক্তি বা মাদক ছেড়ে দেওয়ার উপসর্গ নিরাময়ে তারা এটি ‘স্ব-চিকিৎসা’ হিসেবে ব্যবহার করেন।
মাদক আসক্তি এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথার মহামারির মধ্যে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে ব্যথা নিরসন এবং আসক্তি নিরাময়ের জন্য একটি নিরাপদ বিকল্প খুঁজে পেতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। চিকিৎসা জগতের একটি অংশ সম্প্রতি ক্রাটমকে একটি সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে।

















