শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬

সাপ্তাহিক নবযুগ :: Weekly Nobojug

ত্রুটিপূর্ণ সাজার মতো ঘটনাও রয়েছে

নিউইয়র্কে পুলিশি অসদাচরণে  ব্যয় ৮০ কোটি ডলার 

নবযুগ রিপোর্ট

প্রকাশিত: ২৩:০৯, ৬ মার্চ ২০২৬

নিউইয়র্কে পুলিশি অসদাচরণে  ব্যয় ৮০ কোটি ডলার 

ছবি: সংগৃহীত

নিউইয়র্ক সিটি গত বছর পুলিশি অসদাচরণের মামলা নিষ্পত্তিতে ১১ কোটি ৭০ লাখ ডলারেরও বেশি অর্থ প্রদান করেছে। এর মধ্যে ২০২০ সালে বিক্ষোভকারীদের সহিংসভাবে গ্রেফতার থেকে শুরু করে ১৯৮০-এর দশকে পুলিশের ভুল তদন্তের কারণে হওয়া ত্রুটিপূর্ণ সাজা প্রদানের মতো ঘটনাও রয়েছে। গত সাত বছরে এ ধরনের ক্ষতিপূরণ বাবদ মোট ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। 

গত বছরের বৃহত্তম নিষ্পত্তিগুলোর মধ্যে মোট ২ কোটি ৪১ লাখ ডলার প্রদান করা হয়েছে দুই ব্যক্তিকে, যারা ১৯৮৬ সালে ম্যানহাটনের মিডটাউনে একটি প্রাণঘাতী ডাকাতির ঘটনায় ভুলভাবে গ্রেফতার ও দ-িত হয়ে ২০ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছিলেন। আরেকটি নিষ্পত্তিতে ৫৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার দেওয়া হয়েছে এক ব্যক্তিকে, যিনি অভিযোগ করেছিলেন যে পুলিশের স্টান গানের আঘাতে তিনি তার বাম চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন।
অমুনাফামূলক সংস্থা ‘দ্য লিগ্যাল এইড সোসাইটি’ সোমবার এই বিশ্লেষণটি প্রকাশ করেছে। এমন এক সময়ে এটি সামনে এলো যখন আমেরিকার এই বৃহত্তম শহরটি ৫৪০ কোটি ডলারের বাজেট ঘাটতির মুখে রয়েছে। সামগ্রিক বাজেট হ্রাসের পাশাপাশি মেয়র জোহরান মামদানি এনওয়াইপিডি-র ৬৪০ কোটি ডলারের বাজেট থেকে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার কমানোর প্রস্তাব করেছেন। উল্লেখ্য যে, এই ক্ষতিপূরণের অর্থ এনওয়াইপিডি-র নিয়মিত বাজেটের বদলে শহরের বাজেটের একটি আলাদা অংশ থেকে প্রদান করা হয়, যদিও অনেক জায়গায় এটি সরাসরি পুলিশ বিভাগের পরিচালনা বাজেট থেকেই মেটানো হয়।
সংস্থাটির ‘কপ অ্যাকাউন্টেবিলিটি প্রজেক্ট’-এর তত্ত্বাবধায়ক আইনজীবী জেনভাইন অং বলেন, ‘এই বিশ্লেষণের মূল উদ্দেশ্য হলো এনওয়াইপিডি-র পেছনে আমাদের প্রকৃত কত খরচ হচ্ছে সে বিষয়ে স্বচ্ছতা আনা। আমাদের পর্যবেক্ষণ বলছে, পুলিশ বিভাগে অর্থবহ জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা যা সমাধান করা জরুরি।’
২০২৫ সালে শহরটি মোট ১,০৪৪টি পুলিশি অসদাচরণের মামলা নিষ্পত্তি করেছে, যা ২০১৯ সালের (১,২৭৬টি) পর সর্বোচ্চ। এটি ছিল টানা চতুর্থ বছর যেখানে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ১০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। গত বছরের এই মোট ব্যয় ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৪ সালে শহরটি ৯৮০টি মামলায় ২০ কোটি ৬৪ লক্ষ ডলার প্রদান করেছিল।
তবে এই অঙ্কগুলো পুলিশি অসদাচরণের সামগ্রিক খরচের কেবল একটি অংশ। লিগ্যাল এইড সোসাইটির বিশ্লেষণে শুধুমাত্র আদালতের মামলার নিষ্পত্তিগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু সিটি কম্পট্রোলার (আর্থিক বিষয়ের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা) আনুষ্ঠানিক মামলার আগেই যে দাবিগুলো নিষ্পত্তি করেন, তা এখানে ধরা হয়নি।
গত বছরের ক্ষতিপূরণের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার দেওয়া হয়েছে ভুল সাজার কারণে এবং ২ কোটি ৮০ লাখ ডলার (মোট ব্যয়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ) দেওয়া হয়েছে দুই দশকেরও বেশি সময় আগের ঘটনার প্রেক্ষিতে। এনওয়াইপিডি জানিয়েছে, ২০১৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ব্যয় হওয়া ৭৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারের একটি বড় অংশই এ ধরনের পুরনো মামলার জন্য খরচ হয়েছে।
বিভাগটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ’যদিও এই মামলাগুলোর সমাধান করা অত্যন্তগুরুত্বপূর্ণ, তবে এগুলো বর্তমান পুলিশিং ব্যবস্থার অবস্থা সম্পর্কে কিছু নির্দেশ করে না।’ পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ-এর অধীনে এনওয়াইপিডি জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন পুরনো নীতিগুলো পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
১৯৮৬ সালের সেই ডাকাতির মামলায় ভুল সাজাপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তি এরিক স্মোকস এবং ডেভিড ওয়ারেন যথাক্রমে ১ কোটি ৩০ লাখ এবং ১ কোটি ১১ লাখ ডলার পেয়েছেন। ২০২৪ সালে দায়ের করা মামলায় তারা অভিযোগ করেন যে, এক দুর্নীতিগ্রস্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিজের অন্য একটি ডাকাতির মামলা থেকে বাঁচতে চাওয়া ১৭ বছর বয়সী এক মাদকাসক্ত ও মানসিকভাবে অসুস্থ কিশোরের কথার ওপর ভিত্তি করে তাদের ফাঁসিয়েছিলেন। মামলার তথ্য অনুযায়ী, চারজন সাক্ষীর মধ্যে তিনজনই ফৌজদারি মামলার হুমকির মুখে পড়ে স্মোকস ও ওয়ারেনকে খুনি হিসেবে শনাক্ত করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
অন্য একটি নিষ্পত্তিতে ৩৯ লাখ ডলার পেয়েছেন স্টিভেন লোপেজ। তিনি ১৯৮৯ সালে সেন্ট্রাল পার্কে এক নারী দৌড়বিদকে ধর্ষণের ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত সেই বিখ্যাত ‘সেন্ট্রাল পার্ক ফাইভ’ (বর্তমানে ‘এক্সোনরেটেড ফাইভ’ নামে পরিচিত)-এর সাথে গ্রেফতার হওয়া ষষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন। তীব্র পুলিশি ও সামাজিক চাপে পড়ে লোপেজ একটি লঘুতর অপরাধে দোষ স্বীকার করেছিলেন, যা পরে বাতিল করা হয়।
অন্যান্য নিষ্পত্তির মধ্যে রয়েছে ১৭ লাখ ডলারের একটি তহবিল, যা চারজন বিক্ষোভকারীকে দেওয়া হয়েছে। তারা অভিযোগ করেছিলেন, ২০২০ সালের জুনে ব্রুকলিনে জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভের সময় কর্মকর্তারা তাদের লাঠি দিয়ে পিটিয়েছেন বা মাটিতে আছড়ে ফেলেছেন। এছাড়া, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দুজন পুলিশ কর্মকর্তার সাজানো মামলায় ফেঁসে যাওয়া নয়জন ব্যক্তিকে ৫২ লাখ ডলার প্রদান করেছে শহরটি।
‘স্টপ-অ্যান্ড-ফ্রিস্ক’ বা থামিয়ে তল্লাশি নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত
গত সপ্তাহে আদালত নিযুক্ত একজন পর্যবেক্ষক এনওয়াইপিডি-র সমালোচনা করে বলেছেন, কর্মকর্তারা ‘স্টপ-অ্যান্ড-ফ্রিস্ক’ বা সন্দেহভাজনদের থামিয়ে তল্লাশি করার কৌশলের ব্যবহার সঠিকভাবে নথিভুক্ত করছেন না। ২০১৩ সালে একজন ফেডারেল বিচারক রায় দিয়েছিলেন, অস্ত্র ও মাদকের সন্ধানে কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক নিউ ইয়র্কারদের ঘনঘন তল্লাশি করা তাদের নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন। পর্যবেক্ষক মাইলান এল. ডেনারস্টাইন বলেন, এরপর থেকে বিভাগটি এই হার কমিয়ে আনলেও সাংবিধানিক সুরক্ষা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এখনও সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
জেনভাইন অংয়ের মতে, এই বিপুল পরিমাণ ক্ষতিপূরণ ব্যয়ই বলে দেয় যে অসদাচরণ কমাতে আরো অনেক কাজ করা প্রয়োজন। তিনি যোগ করেন, ‘এই জরিমানা ও নিষ্পত্তিগুলো শহরের বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করছে এবং ভুক্তভোগীদের কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী মানসিক আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’
 

শেয়ার করুন: