ছবি: সংগৃহীত
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে নির্বাচনে তার দল বিএনপি প্রত্যাশিত জয়লাভ করবে এতে কারো কোনো সন্দেহ ছিলো না। কিন্তু আমি কেনো “তারেক ম্যাজিকে অবাক বাংলাদেশ” লিখছি তার ব্যাখ্যা দিতে একটু অতীতে ফিরে যেতে হবে।
হাসিনা আমলের দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসন, বিলুপ্ত গণতন্ত্র এবং বাকস্বাধীনতার ক্রান্তিলগ্নে নোবেলজয়ী ড. ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশের শাসন ক্ষমতা হাতে নেয়। ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নিয়ে তারা দেড় বছরেও দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়। এ অবস্থায় লন্ডনে নির্বাসনে থেকেও গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে তারেক রহমান বারবার নির্বাচনের দাবি জানাতে থাকেন। শুরু হয় তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার। স্বৈরাচারের পতন হলেও তিনি যাতে দেশে ফিরতে না পারে তা নিয়ে শুরু হয় দেশি-বিদেশি চক্রান্ত।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, ২০০৭ সালের কুখ্যাত ওয়ান ইলেভেনের পর তারেক রহমানকে একাধিক মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হয়। সেনা সমর্থিত মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকার এ সময় তার উপর অকথ্য শারীরিক নির্যাতন চালায়। তাদের উদ্দেশ্য ছিলো তারেক রহমানকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়া। কিন্তু সেটা সম্ভব না হওয়ায় তাকে লন্ডনে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়। তারেক রহমান অসুস্থতা দূর করতে নির্বাসিত অবস্থায় যখন চিকিৎসা নিচ্ছেন তখন তার মা তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকেও মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে সেনা সমর্থিত সরকার। অন্যদিকে তারেক রহমানের একমাত্র ছোট ভাই আরাফাত রহমানের বিরুদ্ধেও একাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। পরে অবশ্য কোকো মালয়েশিয়াতেই মারা যান।
সেনা সমর্থিত সরকার পলাতক স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সাথে গোপন আঁতাত করে তাকে প্রহসনের নির্বাচন করে ক্ষমতায় বসায় ২০০৮ সালে।
শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে নতুন নতুন মিথ্যা মামলা দায়ের করতে থাকে। আবারও গ্রেফতার করা হয় পুত্রশোকে কাতর অসুস্থ খালেদা জিয়াকে। বিনা চিকিৎসায় খালেদা জিয়াকে বন্দি করে রাখা হয় পরিত্যাক্ত একটি কারাগারে। যেখানে আলো-বাতাস যেতো না। বিদ্যুত ছিলো না। এ অবস্থায় খালেদা জিয়া যারপরনাই অসুস্থ হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে যান। বিএনপিসহ নানা মহলের দাবির পরেও তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে বাধা দেয়া হয়।
মামলার জাল এবং নানা বাধা নিষেধে ছোট ভাইয়ের লাশ দেখতে দেশে আসতে পারেননি তারেক রহমান।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ইউনূস সরকার ক্ষমতা পেলেও তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিরুদ্ধে অদৃশ্য শক্তি কাজ করতে থাকে। কিন্তু তারপরও নানা বাধা পেরিয়ে গত বছর ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। তিনি যেদিন দেশে ফিরেন সেদিন থেকে নির্বাচনের বাকী ছিলো মাত্র ৪০ দিন। মাত্র ৪০ দিনের মধ্যে তাকে সশরীরে নির্বাচন কমিশনে গিয়ে ভোটার হতে হয়েছে, এনআইডি কার্ড নিতে হয়েছে, নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বোর্ডে বসতে হয়েছে, প্রার্থী চূড়ান্ত করতে হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি ছাড়াও জোটের নেতাদের সাথে একাধিক বৈঠক করতে হয়েছে, তাদের জন্য আসন ভাগাভাগি নিয়ে আলোচনা করতে হয়েছে। এ ছাড়া নানা সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সাথে আলোচনা করাসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিতে হয়েছে।
তিনি দেশে ফেরার মাত্র ৪ দিন পর তার মমতাময়ী মা আপোষহীন নেত্রী খালেদা জিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।
একমাত্র অভিভাবকের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে আসে তার পরিবারে। তাদের সাথে সারা বাংলাদেশের মানুষ শোকে ব্যাকুল হয়ে পড়েন। কারণ রাজনীতির এই সমস্যা সংকুল সময়ে বেগম জিয়া ছিলেন সবার অভিভাবকসম।
এই অবস্থায় নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে তারেক রহমানের কাঁধে বর্তায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব।
অনেক বছর পরে অসুস্থ মাকে কাছে পেলেও তার সেবা করার তেমন সুযোগই পেলেন না তারেক রহমান।
মা’র মৃত্যুর চাপা কষ্ট বুকে চেপে নেমে পড়েন ভোট প্রার্থনায়। মূলত লন্ডন থেকে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষ করে দেশে এসে একটা মুহুর্তের জন্যও বিশ্রাম নিতে পারেননি। তিনি ১২ তারিখের নির্বাচনের একদিন আগে দিন পর্যন্ত দিন-রাত ২৪ ঘন্টাই চষে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। তার উদ্দেশ্য ছিলো নতুন বাংলাদেশে মানুষের মনের কথা শোনা, নিজের স্বপ্নের কথা বলা। বাংলাদেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে, বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে আবারও একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করতে বিএনপির বিজয়ের বিকল্প ছিলো না। সেই চিন্তা থেকেই গত ৪০ টি দিন বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সাথে মিশে ছিলেন।
এত স্বল্প সময়ে নানা বাধা বিপত্তি পেরিয়ে ১৮ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলকে জনগণকে সাথে নিয়ে আবারো সরকার গঠনের পথে নিয়ে আসলেন তারেক রহমান। মাত্র ১৮ দিনের নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি দেশের কোটি কোটি ভোটারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন, কেনো বিএনপিকে বিজয়ী করতে হবে। এটাই হচ্ছে “তারেক ম্যাজিক।”
তারেক রহমান প্রায় ৪ দশক আগে যখন বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ নেন তখন তিনি একজন তরুণ। যোগ্য বাবা-মা’ র সন্তান হিসেবে তিনি নিজেকে প্রমাণ করতে প্রায় ৪০ বছর সময় নিয়েছেন। তার মা যদি আর কয়েকটা দিন বেঁচে থাকতে পারতেন তাহলে হয়তো তার ছেলের সাফল্য দেখে তাকে একজন “ম্যাজিশিয়ান”ই বলতেন।
লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক, নিউইয়র্ক।

















