ছবি: সংগৃহীত
তাঁকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র হয়েছে অনেক। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল রাজনীতিতে ফেরার সব দুয়ার। কিন্তু মানুষের মনের মন্দিরে যে নাম লেখা হয়ে আছে, তা মুছবার সাধ্য ছিল না কারো। গণতন্ত্র প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক দিনে সেই নামটিই যেন ব্যালটে লিখে দিয়েছে কোটি মানুষ।
এর মধ্য দিয়ে নির্বাসনের দীর্ঘ আঁধার পেরিয়ে জনগণের আস্থার আলোয় ফুটে উঠেছে সেই নাম তারেক রহমান।
বহু প্রতিকূলতা, নির্বাসন আর দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই পেরিয়ে তারেক রহমান আজ দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এক মহাগুরুত্বপূর্ণ মোড়ে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সর্বশেষ বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, তাঁর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে। ফলে সাবেক দুই কা-ারীর সন্তান তারেক রহমান শুধু ক্ষমতার উত্তরাধিকার নন, আস্থার রাজনীতিতে এক অবশ্যম্ভাবী ও সাহসী অধ্যায়ের নাম হয়ে উঠতে যাচ্ছেন।
জনতার চোখের মণি হয়ে ওঠার এই পথে তারেক রহমান রেখে এসেছেন নির্বাসন, নিপীড়ন, ত্যাগ, রক্ত আর চ্যালেঞ্জের কঠিন অধ্যায়; যা তাঁকে ভাঙেনি, বরং গড়ে তুলেছে নেতৃত্বের নতুন উচ্চতায়।
তারেক রহমানের শৈশব-কৈশর, শিক্ষাজীবনের দিনগুলোর নানা কথা ছড়িয়ে রয়েছে। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সন্তান হয়েও কোনো ধরনের পাননি। আর দশজন শিক্ষার্থীর মতোই ছিল তাঁর শিক্ষাজীবন।
জানা গেছে, ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা তারেক রহমানকে যেন রাষ্ট্রপতির সন্তান কোটায় পার পাইয়ে দেওয়া না হয়, সেই নির্দেষ ছিল খোদ জিয়াউর রহমানের। সেই সময় থেকেই তারেক রহমানের ভেতরে সততা ও নিষ্ঠার বীজ বপন হয়।
বহুল চর্চিত এই গল্পটি কমবেশি সবারই জানা। এ বিষয়টির সত্যতা জানতে কথা হয় টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক লেখক সুবাইল বিন আলমের সঙ্গে। তিনি তারেক রহমানের কৈশরের অনেক গল্পের সাক্ষী।
বিশেষ করে বিএফ শাহীন কলেজের ছাত্র হওয়ায় শিক্ষকদের কাছে তারেক রহমানের বিষয়ে শুনেছেন অনেক গল্প।
সুবাইল বলেন, তারেক রহমান রাষ্ট্রপতির সন্তান হলেও স্কুল-কলেজে বাড়তি কোনো প্রাধান্য পাননি। বরং এমন পারিবারিক অনুশাসনে তিনি বেড়ে ওঠেন, তাঁর আচরণে মনেই হতো না যে তিনি অন্য শিক্ষার্থীদের চেয়ে আলাদা কেউ। সাইকেল চালিয়ে যেতে যেতে কোনো শিক্ষককে দেখলে নেমে সালাম দিতেন।
তিনি আরো বলেন, ‘বিএএফ শাহীন কলেজের সূত্র ধরে উনি (তারেক রহমান) আমার কলেজের বড় ভাই। যখন ছাত্র ছিলাম, সিনিয়র শিক্ষকদের কাছে গল্প শুনতে চেয়েছিলাম। তখন বিএনপি ক্ষমতায়। যারা উনাকে ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন, কেউ উনাকে চরম মেধাবী বলেননি। কিন্তু তাঁর আচরণের প্রশংসা সব সময়ই ছিল। এক শিক্ষক বলেছিলেন, জিয়ার কড়া নির্দেশ ছিল, কখনোই যেন রাষ্ট্রপতির ছেলে হিসেবে ট্রিট না করা হয়। ফলে তখনকার আমলের বেত্রাঘাত দেওয়া হলেও কখনোই কোনো শিক্ষককে নাজেহাল হতে হয়নি।’
মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তারেক রহমানের বয়স ছিল মাত্র চার বছর। মায়ের সঙ্গে তিনিও বন্দি। সেই সময়ের স্মৃতি হয়তোবা মনে নেই। তবে এরপর তাঁর জীবনে এসেছে অনেক ঝড়। প্রথম ধাক্কা ছিল ১৯৮১ সালে। আকস্মিকভাবে জিয়াউর রহমান শহীদ হলে রাজনীতি আর রাষ্ট্রক্ষমতার নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয় একটি পরিবার। তার গ্র্যাজুয়েশনের সময় মা বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন গৃহবন্দি। কঠিন সেই পরিস্থিতিতে তাঁর জীবনে যুক্ত হয় দীর্ঘ অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা। কৈশোর পেরোতেই তিনি বুঝতে শেখেন, এই পরিচয় কেবল উত্তরাধিকার নয়, এটি দায়িত্ব, ঝুঁকি আর বিরামহীন নজরদারির নাম। রাজনীতির টান তাঁকে ধীরে ধীরে টেনে নেয় কেন্দ্রবিন্দুর দিকে।
জানা গেছে, ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মা খালেদা জিয়ার সঙ্গে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নেন। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে দলের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনেও তাঁর কৌশল বিরাট ভূমিকা রাখে। মূলত ওই নির্বাচনের পরই রাজনীতিতে তিনি বেশি পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
তবে খালেদা জিয়ার শাসনামলে তিনি মন্ত্রিসভা কিংবা সংসদীয় রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হননি। ফলে ক্ষমতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল পরোক্ষ, কিন্তু দায়িত্ববোধ ছিল প্রত্যক্ষ।
বিএনপির ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তারেক রহমানও যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির গাবতলী উপজেলা ইউনিটের সদস্য হিসেবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে সক্রিয় হন। ২০০২ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন।
২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আটক করা হয়েছিল তারেক রহমানকে। প্রায় দেড় বছর কারাগারে থাকার পর ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেয়ে চাপের মুখে সপরিবারে লন্ডনে চলে যান তিনি।
পরে ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তারেক রহমান দলের জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার খালেদা জিয়াকে আটক করার পর থেকে তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়ে আসছে বিএনপি। কিন্তু তাঁর ওপর অব্যাহত থাকে আওয়ামী জাঁতাকল। দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয় তাঁকে। দলীয় রাজনীতির উত্থান-পতন, মামলা-মোকদ্দমা, নির্বাসন—সব মিলিয়ে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় বড় হয়ে উঠেছে শারীরিক অনুপস্থিতির মধ্য দিয়েই।
সেই অনুপস্থিতির অধ্যায় ভাঙে এবারের নির্বাচনে। গত ২৫ ডিসেম্বর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন তিনি। দেশে ফিরেই তিনি লাখো জনতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন, ‘উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান (আমাদের একটি পরিকল্পনা আছে)’। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে পা ফেলার আগেই ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় হারান মাকে। মাথার ওপর থেকে বটবৃক্ষ হারিয়ে হয়ে যান একা। শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই শুরু হয় নির্বাচনী পথে যাত্রা।
এর মধ্য দিয়ে সরাসরি ভোটের মাঠে নেমে তিনি কেবল প্রার্থী নন, দলের প্রধান কৌশলনির্ধারক, প্রচারণার মুখ এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন। অল্প সময়েই তিনি সমগ্র দেশ চষে বেড়ান। মানুষের মন জয় করে নেন। এই প্রথমবার ভোটাররা তাঁকে কেবল উত্তরাধিকার হিসেবে নয়, দায়িত্বশীল রাজনীতিক হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ (সদর) আসনে প্রার্থী হন তারেক রহমান। গত রাত ১টায় বেসরকারি ফল অনুযায়ী, বগুড়ায় এক লাখ ১৮ হাজার ৬৫৮ ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করেন। ঢাকা-১৭ আসনেও জয়ী হয়েছেন তিনি। এভাবে অনেক বন্ধুর পথ পেরিয়ে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন তারেক রহমান।
নব্বইয়ের গণ-আন্দোলন, পরবর্তী সময়ে দলের সাংগঠনিক কাজ, মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিণতিটা কোনো একক ঘটনার ফল নয়, বরং ধারাবাহিক অভিঘাতের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা এক মানসিক প্রস্তুতি। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা যেমন তাঁকে দৃঢ় করেছে, তেমনি নির্বাসনকালে বিচারিক চাপ তাঁকে দিয়েছে ধৈর্য আর পুনর্গঠনের শিক্ষা।
এই দীর্ঘ পথচলায় স্মৃতি হয়তো সব সময় স্পষ্ট ছিল না, কিন্তু অভিজ্ঞতা জমেছে স্তরে স্তরে। আর সেখান থেকেই তৈরি হয়েছেন এক রাজনীতিক, যাঁর শৈশব কেটেছে অনিশ্চয়তায়, যৌবন কেটেছে নির্বাসনে, আর পরিণতি দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক সংবেদনশীল মোড়ে।
এ জন্য তারেক রহমানকে ঘিরে দেশবাসীর আকাঙ্খাও অনেক। একদিকে মা-বাবা দুজনই দেশের ইতিহাসের অসম্ভব জনপ্রিয় রাষ্ট্রনেতা। উত্তরাধিকার সূত্রে তারেক রহমানকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে বাড়তি প্রত্যাশা। রাজনীতিতে তাঁর প্রত্যাবর্তন তাই কেবল ব্যক্তিগত অধ্যায় নয়, এটি বহু মানুষের আশা-ভরসার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ঘটনা।
এ ছাড়া শৈশবে তাঁর ভেতরে যে পারিবারিক সততার বীজ রোপিত হয়েছিল, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় সেই শিক্ষারই প্রতিফলন দেখতে চায় মানুষ, এটাই জাতির প্রত্যাশা। প্রয়াত বাবা জিয়াউর রহমান যে সততা, শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠার দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তাঁরই উত্তরাধিকার বহন করবেন তিনি, এমন বিশ্বাসে আস্থার জায়গাটা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতার চেয়েও বড় হয়ে উঠুক নৈতিকতা, রাজনীতির চেয়েও অগ্রাধিকার পাক রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থ, এই বার্তারই প্রতিফলন আজ জনগণ দেখতে চাইছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে।

















